প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপির নিরাপত্তা দুর্বলতা দূর করতে প্রয়োজনীয় হালনাগাদ না করায় দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট সাইবার হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে। ঝুঁকির তালিকায় আছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) একাধিক ওয়েবসাইট। তবে এসব ওয়েবসাইট থেকে শিক্ষার্থীদের তথ্য চুরি বা ফাঁস হয়েছে, এমন কিছু এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পিএইচপির এই দুর্বলতার কারণে একপর্যায়ে দেশের হাজারের বেশি সরকারি-বেসরকারি ওয়েবসাইট ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত হয়েছিল। সর্বশেষ হিসাবে এখনো শতাধিক ওয়েবসাইট ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর বেশির ভাগই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের। তবে সরকারি সংস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটও এ তালিকা থেকে বাদ যায়নি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঝুঁকিতে থাকা ওয়েবসাইটের তালিকা বেশ দীর্ঘ। এতে আছে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট। আরও আছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং সাপোরো ডেন্টাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের বিভিন্ন ওয়েবসাইট।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ঝুঁকিতে পড়াকে বিশেষভাবে উদ্বেগের চোখে দেখা হচ্ছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় সাইট, অনলাইন লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং ভর্তি ও বিভিন্ন সেবার পোর্টালে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য, নিবন্ধনসংক্রান্ত উপাত্ত ও একাডেমিক কার্যক্রমের তথ্য সংরক্ষিত থাকতে পারে। দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে কেউ অনুমতি ছাড়া ঢুকে পড়লে এসব তথ্যের গোপনীয়তা ও সঠিকতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ব্যক্তিগত তথ্য একবার বাইরে চলে গেলে তা ফেরানো প্রায় অসম্ভব, তাই এ ধরনের ঝুঁকিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ কম।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, পিএইচপির পুরনো বা যে সংস্করণের নিরাপত্তা সহায়তা আর দেওয়া হয় না, সেটি ব্যবহার করলে ওয়েবসাইট ও সার্ভারে অনুমতি ছাড়া প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হয়। ইন্টারনেট থেকে সরাসরি প্রবেশ করা যায়, এমন সার্ভার দ্রুত হালনাগাদ না করলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। এ ধরনের দুর্বলতা পেলে হামলাকারীরা সার্ভারে ক্ষতিকর কোড চালানো কিংবা ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। সহজ ভাষায়, সফটওয়্যারের পুরনো সংস্করণ অনেকটা তালা ছাড়া দরজার মতো, যার দুর্বলতা হামলাকারীদের কাছে আগে থেকেই জানা থাকে।
বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আগে সতর্কতা জারি হয়েছিল। ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাথিউ প্রিন্সের তথ্য অনুযায়ী, দুর্বলতার খবর প্রকাশ্যে আসার প্রথম ১০ ঘণ্টাতেই হামলার চেষ্টা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছায়। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, নিরাপত্তা ত্রুটি জানাজানি হওয়ার পর হামলাকারীরা কত দ্রুত তা কাজে লাগাতে তৎপর হয়। ফলে হালনাগাদে দেরি করার সুযোগ খুব সীমিত।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা বিজিডি ই-গভ সার্ট দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ অপারেটর, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করেছে। সংস্থাটির পরামর্শ, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যেন নিজেদের সিস্টেমে পিএইচপি ব্যবহার হচ্ছে কি না এবং হলে কোন সংস্করণ চলছে, তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়।
সার্টের নির্দেশনায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সার্ভারগুলোকে। এসব সার্ভারের নিরাপত্তা হালনাগাদ আগে করতে বলা হয়েছে। কোনো কারণে তাৎক্ষণিক হালনাগাদ সম্ভব না হলে ঝুঁকিপূর্ণ সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা কিংবা প্রবেশাধিকার সীমিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সার্ভারের লগ পরীক্ষা করে দেখতে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে কেউ অস্বাভাবিকভাবে প্রবেশের চেষ্টা করেছে কি না।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জানিয়েছেন, ঝুঁকি মোকাবিলায় সময়মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, সতর্কবার্তা পেয়ে ইতিমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা নিয়েছে এবং নিজেদের সিস্টেম নিরাপদ করেছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহায়তা দরকার, তাদের আইসিটি বিভাগ থেকে সহযোগিতা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সরকার ভিন্ন পথে হাঁটছে। সচিব জানান, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা করে সতর্ক না করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠানো হবে। এতে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি কমবে এবং ওয়েবসাইট ও সার্ভারের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে সতর্কতা ও সহায়তার উদ্যোগ আছে। তবে একপর্যায়ে হাজারের বেশি ওয়েবসাইট ঝুঁকিতে থাকা এবং এখনো শতাধিক সাইট একই অবস্থায় থাকার তথ্য বলছে, হালনাগাদের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিশেষ করে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে অনেক ওয়েবসাইট ও সেবা চালু থাকে, ফলে সবকিছু একসঙ্গে হালনাগাদ করা কঠিন হতে পারে। এ কারণে নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

