কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) এগিয়ে যাওয়ার দৌড়ে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট। কিন্তু সেই প্রযুক্তিই এখন প্রতিষ্ঠানটির প্রচলিত সার্চ ব্যবসার আয় নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। এআইনির্ভর সার্চ ব্যবস্থায় ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও সেখানে বিজ্ঞাপন থেকে আয় তুলনামূলক কম হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল ব্যয় ও নগদ অর্থের প্রবাহে চাপ। এসব উদ্বেগের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) অ্যালফাবেটের শেয়ারের দাম ১২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে যায়। এক দিনেই প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য থেকে মুছে যায় প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার।
বাজারে এই ধাক্কার পেছনে ছিল অ্যালফাবেটের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল। গত ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের আয় দাঁড়িয়েছে ১২৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি। তবে এই আয় বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বিশেষ করে বিজ্ঞাপন ব্যবসায় প্রত্যাশার তুলনায় কম আয় বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে বিজ্ঞাপন থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৮২ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা ছিল ৮৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
আয়ের এই ব্যবধানের পেছনে গুগলের নতুন এআই সার্চ ব্যবস্থা ‘এআই মোড’-এর প্রভাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ব্যবসায়িক কর্মকর্তা ফিলিপ শিন্ডলার। এআই মোডে ব্যবহারকারী সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর পান। ফলে প্রচলিত সার্চের মতো বিভিন্ন ওয়েবসাইটের লিংক ও বিজ্ঞাপন দেখার ধরন বদলে যাচ্ছে। শিন্ডলারের ভাষ্য অনুযায়ী, এআই মোডে সার্চের ব্যবহার বাড়লেও সেখানে বিজ্ঞাপন থেকে আয় প্রচলিত সার্চের তুলনায় কম। ফলে এআইনির্ভর সার্চের বিস্তার সার্চ বিজ্ঞাপনের প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে। তবে বিষয়টি এমন নয় যে গুগলের সার্চ ব্যবসার আয় কমে গেছে। বরং সার্চ ও অন্যান্য বিজ্ঞাপন থেকে আয় আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে সার্চের প্রশ্ন বা কুয়েরির প্রবৃদ্ধিও গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়েছে। অর্থাৎ ব্যবহার বাড়ছে, কিন্তু সেই ব্যবহার থেকে আয় করার পদ্ধতি এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিজ্ঞাপন ব্যবসায় এই চাপের পাশাপাশি এআই অবকাঠামো তৈরিতে ব্যয়ও বাড়ছে। ডেটা সেন্টার, সার্ভার, নিজস্ব চিপ ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে বিপুল অর্থ খরচ করছে অ্যালফাবেট। সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির অবাধ নগদ প্রবাহ বা ফ্রি ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক ৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ পরিচালন কার্যক্রম থেকে আসা নগদ অর্থের তুলনায় মূলধনি ব্যয় বেশি হয়েছে। একই সময়ে গুগল ক্লাউডের আয় ১০৩ শতাংশ বেড়ে ৩০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ক্লাউড ব্যবসার এই প্রবৃদ্ধি এআই প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ারই ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন, এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তা থেকে যথেষ্ট নগদ আয় কবে আসবে? অ্যালফাবেটের অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, ২০২৭ সালে মূলধনি ব্যয় চলতি বছরের সম্ভাব্য ১৯৫ থেকে ২০৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়তে পারে।
এআই অবকাঠামোতে বিনিয়োগের চাপ শুধু গুগলের নয়। অ্যামাজনও তৃতীয় প্রান্তিকে ২০১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। তবে প্রতিষ্ঠানটির ফ্রি ক্যাশ ফ্লো গত ১২ মাসে ঋণাত্মক ৪২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। মূলত এআই অবকাঠামো তৈরিতে সম্পদ ও সরঞ্জাম কেনার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলাফল প্রকাশের পর অ্যামাজনের শেয়ারও লেনদেন-পরবর্তী সময়ে ৬ শতাংশের বেশি কমে যায়। অন্যদিকে মাইক্রোসফটের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে আয় ১৯ শতাংশ বেড়ে ৯২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি একই সময়ে ১৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের ইতিবাচক ফ্রি ক্যাশ ফ্লো তৈরি করেছে। অর্থাৎ এআই খাতে বড় বিনিয়োগ করলেও ব্যবসা থেকে নগদ অর্থ উৎপাদনের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে কি না, সেটিই এখন বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তি খাতের এই পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, এআই প্রতিযোগিতায় শুধু নতুন প্রযুক্তি তৈরি বা ব্যবহারকারী বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। সেই প্রযুক্তি থেকে আয় কতটা বাড়ছে, বিনিয়োগের খরচ কত দিনে উঠে আসবে এবং ব্যবসার নগদ প্রবাহ কতটা শক্তিশালী থাকবে, সেগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গুগলের ক্ষেত্রে উদ্বেগটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস সার্চ বিজ্ঞাপন। এআই যদি মানুষের তথ্য খোঁজার অভ্যাস বদলে দেয়, তাহলে প্রচলিত বিজ্ঞাপন মডেলকেও নতুনভাবে সাজাতে হবে। ফলে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য কমে যাওয়াকে শুধু একটি খারাপ প্রান্তিকের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এআইয়ে বিপুল বিনিয়োগের আর্থিক সুফল নিয়ে প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদের বাড়তে থাকা সতর্কতারও প্রতিফলন।
তথ্যগত স্পষ্টীকরণ: অ্যালফাবেটের ৫০০ বিলিয়ন ডলার কমার অর্থ প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাব থেকে এই পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে যাওয়া নয়। শেয়ারের দাম কমায় বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানিটির মোট বাজারমূল্য কমেছে। একইভাবে এআই মোডের কারণে গুগলের বিজ্ঞাপন আয় সরাসরি কমে গেছে, এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়; বিজ্ঞাপন আয় বেড়েছে, তবে প্রত্যাশার চেয়ে কম এবং এআই মোডে বিজ্ঞাপন থেকে আয় এখনো তুলনামূলক সীমিত।

