কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখন এক অভাবনীয় গতির প্রতিযোগিতা চলছে যেখানে গুগল ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রপিক একে অপরের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু ব্যবসার মাঠে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এই তীব্র লড়াইয়ের মধ্যেও তারা একটি জায়গায় একজোট হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর তা হলো এআই নিরাপত্তা। প্রযুক্তি বিশ্বের শীর্ষ এই তিন প্রতিষ্ঠান মিলে সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি তদারককারী সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে যার নাম দেওয়া হয়েছে স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি ফর ফ্রন্টিয়ার এআই বা সাফা। আশা করা হচ্ছে চলতি বছরের শেষে কিংবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে এই সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করবে। মূলত নতুন প্রজন্মের উন্নত মডেলগুলো বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়ার আগে সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই জোটবদ্ধ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যা প্রযুক্তি দুনিয়ায় একটি নতুন নজির।
নিজেদের লাগাম নিজেদের হাতে রাখার কৌশল
প্রশ্ন জাগতে পারে হঠাৎ কেন ঘোর প্রতিযোগীরা একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্মে আসতে চাইছে। এর পেছনের মূল কারণটি শুধু প্রযুক্তিগত নয় বরং গভীরভাবে ব্যবসায়িক এবং কৌশলগত। এআই প্রযুক্তির প্রসার যত বাড়ছে সাইবার নিরাপত্তা এবং এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও তত মারাত্মক আকার ধারণ করছে। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের এআই মডেলে যদি বড় ধরনের নিরাপত্তা ত্রুটি দেখা দেয় তবে পুরো শিল্পের ওপরই মানুষের এবং সরকারগুলোর আস্থা নষ্ট হবে যা ট্রিলিয়ন ডলারের এই বাজারের জন্য বড় হুমকি। তাছাড়া প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে বর্তমানে মার্কিন সরকারের অধীনে থাকা সংস্থাগুলোর কাছে সর্বাধুনিক মডেলগুলো পরীক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত বাজেট বা কারিগরি সক্ষমতা নাও থাকতে পারে। তাই সরকার কঠোর কোনো আইন চাপিয়ে দেওয়ার আগেই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো চাইছে নিজেদের উদ্যোগে একটি মানদণ্ড তৈরি করতে যাতে ব্যবসার মূল গতি ব্যাহত না হয়।
নতুন এই স্বাধীন সংস্থাটির কাঠামো এবং নেতৃত্ব নিয়ে এরই মধ্যে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী সাফা এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও পদে দায়িত্ব পালনের জন্য বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। এর মধ্যে হোয়াইট হাউসের সাবেক এআই নীতি উপদেষ্টা শ্রীরাম কৃষ্ণনের নাম বেশ জোরেসোরে শোনা যাচ্ছে। পাশাপাশি হোয়াইট হাউসের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি বিষয়ক দপ্তরের সাবেক পরিচালক আরতি প্রভাকরও সম্ভাব্য সিইও হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। এই সংস্থাটি ঠিক কীভাবে কাজ করবে তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। তারা শুধু তাত্ত্বিক মানদণ্ড ঠিক করে দেবে নাকি ডেভেলপারদের সঙ্গে নিয়ে একেবারে ল্যাবে বসে মডেলগুলোর কারিগরি নিরাপত্তা পরীক্ষা করবে সেই বিষয়গুলো এখন নির্ধারণ করা হচ্ছে।
আর্থিক খাতের মডেলে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ
এআই শিল্পের জন্য এমন একটি স্বনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের ধারণা একেবারে নতুন নয়। গুগল ডিপমাইন্ডের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিস কয়েক মাস আগেই এমন একটি কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রি রেগুলেটরি অথরিটি বা ফিনরা এর উদাহরণ টেনে বলেছিলেন এআই খাতেও এমন সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্বের একটি মডেল দরকার। ফিনরা যেমন শেয়ার বাজার ও ব্রোকারদের ওপর নজরদারি করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেয় সাফা ঠিক একইভাবে কাজ করতে পারে। ওপেনএআইও সম্প্রতি জানিয়েছে তারা একটি যৌথ নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরিতে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। এটি সফল হলে ডেভেলপাররা একটি নির্দিষ্ট ছকের মধ্যে থেকে তাদের বাণিজ্যিক উদ্ভাবনগুলো নিরাপদে বাজারে আনতে পারবেন।
এই পুরো উদ্যোগটির পেছনে আরেকটি বড় ভাবনার জায়গা তৈরি করেছেন অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই। তিনি সম্প্রতি এআই শিল্পের এই উন্মত্ত গতির লাগাম কিছুটা টেনে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে ফ্রন্টিয়ার মডেল বা সবচেয়ে আধুনিক ও শক্তিশালী এআই তৈরির গতি ইচ্ছাকৃতভাবেই কিছুটা কমানো দরকার যাতে নিরাপত্তার দিকগুলো সমানতালে উন্নত করার পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়। প্রযুক্তির সক্ষমতা যদি নিরাপত্তার চেয়ে বেশি দ্রুতগতিতে বাড়ে তবে তা মানবজাতির পাশাপাশি পুরো ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেমের জন্যই ধ্বংসাত্মক হতে পারে। তাই গুগল ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রপিকের এই নতুন উদ্যোগ শুধু একটি জোট নয় বরং এটি ভবিষ্যতের বৈশ্বিক এআই অর্থনীতিকে নিরাপদ এবং টেকসই করার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

