বাংলাদেশে মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন প্রযুক্তির সংযোজন ঘটেছে। দেশের অন্যতম মোবাইল অপারেটর বাংলালিংক স্টারলিংকের সহযোগিতায় স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল সেবা চালু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই প্রথম দেশ যেখানে এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর মোবাইল সংযোগ চালু হলো।
নতুন এই সেবার মাধ্যমে প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা এলাকাতেও ব্যবহারকারীরা প্রয়োজনীয় যোগাযোগ সুবিধা পাবেন। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা কিংবা সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়লে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলালিংক।
স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল প্রযুক্তি সবচেয়ে বেশি উপকারী হতে পারে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল, দুর্গম এলাকা, সমুদ্রে কর্মরত মানুষ এবং গভীর সমুদ্রে চলাচলকারী জেলেদের জন্য। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার মধ্যেও যেখানে প্রচলিত মোবাইল টাওয়ারের সংযোগ পাওয়া কঠিন, সেখানে এই প্রযুক্তি বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে।
বাংলালিংক জানিয়েছে, এই সেবা ব্যবহারের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন হবে না। একটি সাধারণ ৪জি মোবাইল ফোন এবং বাংলালিংক সিম থাকলেই গ্রাহকেরা এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অ্যাপ ব্যবহার এবং অবস্থান শনাক্তকরণের মতো সেবাও পাওয়া যাবে।
সেবাটি চালুর প্রথম মাসে বাংলালিংক যেকোনো ইন্টারনেট বা মিশ্র প্যাকেজের সঙ্গে বিনামূল্যে স্টারলিংক সুবিধা দিচ্ছে। দ্বিতীয় মাস থেকে নির্দিষ্ট মাসিক ইন্টারনেট ও মিশ্র প্যাকেজের সঙ্গে অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই এই সুবিধা চালু থাকবে। পাশাপাশি গ্রাহকেরা প্রতি মাসে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহারের জন্য পাঁচটি বিনামূল্যের খুদে বার্তা পাবেন।
বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জোহান বুস বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের কাছে সংযোগ পৌঁছে দেওয়া। স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের আরও বেশি মানুষ ও আরও বেশি অঞ্চলে যোগাযোগ সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্যাটেলাইটভিত্তিক এই প্রযুক্তি পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্টারলিংক। পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে থাকা নন-জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট ব্যবহার করে স্টারলিংক ইন্টারনেট ও যোগাযোগ সেবা প্রদান করে।
বাংলাদেশে স্যাটেলাইট সেবা পরিচালনার জন্য ২০২৫ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন নন-জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট ব্যবস্থার জন্য নীতিমালা ও নির্দেশনা তৈরি করে। একই বছর স্টারলিংককে ১০ বছরের জন্য বাণিজ্যিক সেবা পরিচালনার লাইসেন্স দেওয়া হয়। পাশাপাশি রেডিও যোগাযোগ যন্ত্রপাতি আমদানি ও নির্ধারিত ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহারের অনুমোদনও দেওয়া হয়।
গত মাসে বাংলালিংক এই নতুন সেবা চালুর জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পায়। এর ফলে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা বড় ধরনের দুর্যোগের সময় যখন মোবাইল টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন স্যাটেলাইট প্রযুক্তি জরুরি যোগাযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
এছাড়া সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি, পর্যটন, নৌপরিবহন এবং সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকার মানুষের জন্যও এই প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। প্রচলিত মোবাইল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে দেশের ডিজিটাল সংযোগ ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলালিংক বর্তমানে বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর। প্রতিষ্ঠানটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক ভিওনের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং ১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল সেবা চালুর মাধ্যমে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার পথ খুলে যেতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

