কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের সঙ্গে ‘বারবার ও অকারণে’ অপমানজনক বা রূঢ় আচরণ করা ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট বাতিল বা নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। জনপ্রিয় চ্যাটবট ‘ক্লড’ এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি তাদের সাম্প্রতিক বার্ষিক পর্যালোচনার পর ব্যবহারের নীতিমালা হালনাগাদ করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ব্যবহারকারীরা যদি এআই সরঞ্জামের সঙ্গে ক্রমাগত ‘নিষ্ঠুর’ কিংবা চরম অশালীন আচরণ করেন, তবে ক্লড তাদের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেবে এবং প্রয়োজনবোধে স্থায়ীভাবে অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তি দুনিয়ায় নীতিমালার এই পরিবর্তনের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মানবিক সত্ত্বা ও এর সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের শিষ্টাচার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অ্যানথ্রপিক অবশ্য স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, সাধারণ বিরক্তি প্রকাশ, কোনো বিষয়ে যুক্তিতর্ক করা, অন্ধকার বা অস্বস্তিকর থিম নিয়ে সৃজনশীল লেখালেখি কিংবা এআই মডেল পরীক্ষার উদ্দেশ্যে চালানো গবেষণার ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। কেবল স্পষ্টভাবে ইচ্ছাকৃত ও চরম অপমানজনক ব্যবহারের ক্ষেত্রেই কেবল অ্যাকাউন্ট বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপে যাবে তারা। এছাড়া নীতিমালায় এআই-এর অপব্যবহার রোধে আরও কিছু ধারা যুক্ত করা হয়েছে; যেমন অন্যকে উত্ত্যক্ত করা, আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়া, সম্মতি ছাড়া অন্তরঙ্গ ছবি তৈরি করা, অস্ত্র তৈরিতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে অপপ্রচার চালানো বা নির্বাচন ব্যাহত করার চেষ্টা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের এই সিদ্ধান্ত সামনে আসার পর প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতবিভাজিত হয়ে পড়েছে। একদল মনে করছেন, এটি এআই ইন্টারঅ্যাকশনে শিষ্টাচার বজায় রাখার ভালো উদ্যোগ। তবে অন্য পক্ষ এটিকে ‘অ্যানথ্রোপোমর্ফিজম’ বা প্রযুক্তিকে জবরদস্তিমূলকভাবে মানুষের রূপ দেওয়ার ক্ষতিকর চেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন। আয়ারল্যান্ডের আইনি প্রতিষ্ঠান উইলিয়াম ফ্রাইয়ের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ব্যারি স্ক্যানেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, “সংখ্যা বা গণিতের প্রতি কখনোই নিষ্ঠুর হওয়া যায় না। এআই-কে এভাবে মানুষের রূপ দেওয়া বিপজ্জনক, কারণ এতে মানুষ প্রযুক্তির এমন এক কল্পিত সত্ত্বায় বিশ্বাস করা শুরু করে, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।” অন্যদিকে মাইক্রোসফটের এআই বিভাগের প্রধান মুস্তাফা সুলেইমানও অ্যানথ্রপিকের এই পদক্ষেপে বিরক্তি প্রকাশ করে অভিযোগ করেছেন যে, অ্যানথ্রপিক এআই-কে এমনভাবে উপস্থাপন করছে যেন সেটি রক্তমাংসের মানুষ।
এই বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে আরেকটি অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক; এআই-কে ভদ্র ভাষায় ‘দয়া করে’ (Please) বা ‘ধন্যবাদ’ বলা কি আসলেই প্রয়োজন? একদল বিশেষজ্ঞের মতে, অ্যালগরিদমকে এসব সৌজন্যমূলক শব্দ পাঠালে প্রক্রিয়াকরণের জন্য অতিরিক্ত কম্পিউটিং ক্ষমতা বা টোকেন খরচ হয়, যা অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও পরিবেশগত অপচয় ঘটায়। তবে ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান কিছুদিন আগে রসিকতা করে বলেছিলেন, চ্যাটজিপিটিকে ধন্যবাদ জানাতে কোটি কোটি ডলারের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ হলেও ভবিষ্যতের সুফলের কথা চিন্তা করলে তা যুক্তিযুক্ত। তবে মনস্তাত্ত্বিকদের বড় শঙ্কা হলো; চ্যাটবট বা এআই চালিত যন্ত্রের সঙ্গে ক্রমাগত অভদ্র ও রূঢ় ভাষায় কথা বলার চর্চা করতে করতে মানুষ বাস্তব জীবনেও পরিবার, সহকর্মী ও অন্য মানুষদের সঙ্গে একই ধরণের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে, যা সামাজিক মেলবন্ধনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

