মোবাইল গ্রাহকদের জন্য জরুরি ব্যালান্সের সর্বোচ্চ সীমা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করার একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। তবে গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হবে কি না, সেবার শর্তগুলো কতটা সুবিধাজনক হবে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে আপাতত প্রস্তাবটি স্থগিত রাখা হয়েছে।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারী জানিয়েছেন, জরুরি ব্যালান্সের সীমা বাড়ানোর বিষয়ে কমিশনের আগ্রহ রয়েছে। তবে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর ভিন্ন ভিন্ন শর্তে এই সুবিধা দিয়ে থাকে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব বিষয় বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, পর্যালোচনা শেষে পরবর্তী কমিশন সভায় জরুরি ব্যালান্সের সীমা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বর্তমানে মোবাইল গ্রাহকের মূল ব্যালান্স শেষ হয়ে গেলে জরুরি প্রয়োজনে কল, খুদে বার্তা ও ইন্টারনেট সেবা চালু রাখার সুযোগ দেয় জরুরি ব্যালান্স সুবিধা। পরে গ্রাহক টাকা রিচার্জ করলে নির্ধারিত অর্থ কেটে নেওয়া হয়।
গ্রাহকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিটিআরসি এই সেবার জন্য নিয়ন্ত্রক নীতিমালা চালু করে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কমিশন মোবাইল অপারেটরদের কমপক্ষে ১০ টাকা পর্যন্ত জরুরি ব্যালান্স বিনা খরচে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। একই বছরের পরবর্তী সময়ে ১০ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে এবং এর বেশি পরিমাণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়।
বর্তমানে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ২০০ টাকা পর্যন্ত জরুরি ব্যালান্স নিতে পারেন। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এর জন্য ২ টাকা ৭৮ পয়সা পর্যন্ত সেবা ফি নেওয়া হয়। তবে টেলিটকের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা ৫০ টাকা এবং প্রযোজ্য সেবা ফি ৬ টাকা ৯৫ পয়সা পর্যন্ত হতে পারে।
জরুরি ব্যালান্সের সীমা বাড়ানোর আলোচনা শুরু হয় মূলত গ্রামীণফোনের একটি প্রস্তাবের পর। চলতি বছরের মার্চে দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল অপারেটরটি বিটিআরসির কাছে ১০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত জরুরি ব্যালান্স দেওয়ার অনুমতি চায়। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ২০ টাকা পর্যন্ত সেবা ফি নেওয়ার প্রস্তাব দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমানে গ্রাহকদের ব্যবহারের ধরন পরিবর্তন হয়েছে। বড় আকারের প্যাকেজের দাম বৃদ্ধি, ডিজিটাল সেবার ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজন থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে অন্য অপারেটরগুলো বড় অঙ্কের জরুরি ব্যালান্স চালু হলে প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বকেয়া অর্থ আদায়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা জানিয়েছে।
এরপর জুন মাসে বিটিআরসি ও মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের বৈঠকে একটি সমন্বিত প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে সর্বোচ্চ ঋণসীমা, বিভিন্ন স্তরের সেবা ফি, গ্রাহকের যোগ্যতা এবং কোন ধরনের সেবায় এই সুবিধা দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে একটি অভিন্ন নীতিমালা তৈরির কথা বলা হয়।
তবে অপারেটরগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব হয়নি। গ্রামীণফোন জানিয়েছে, জরুরি ব্যালান্স দেওয়ার পদ্ধতি ও আর্থিক ঝুঁকি প্রতিটি অপারেটরের ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে। তাই তারা নিজেদের প্রস্তাব আলাদাভাবে বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে।
অন্যদিকে, জুলাই মাসে অ্যামটব জরুরি ব্যালান্সের সর্বোচ্চ সীমা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১ টাকা থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত জরুরি ব্যালান্সের জন্য কোনো সেবা ফি না নেওয়া এবং ১০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বর্তমান ফি কাঠামো বজায় রাখার কথা বলা হয়। ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত জরুরি ব্যালান্সের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ টাকা ফি নির্ধারণের প্রস্তাব ছিল।
পরবর্তী বৈঠকে বিটিআরসি এই সর্বোচ্চ ফি কমিয়ে ১০ টাকা করার বিষয়ে আলোচনা করে। পরে গ্রামীণফোন, রবি ও টেলিটক ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত জরুরি ব্যালান্সের জন্য সর্বোচ্চ ১০ টাকা ফি নির্ধারণে সম্মতি দেয়। তবে বাংলালিংক ধাপে ধাপে বাড়তে থাকা ফি কাঠামোর প্রস্তাব দেয়।
অপারেটরগুলো আরও জানিয়েছে, কোনো গ্রাহক কত টাকা পর্যন্ত জরুরি ব্যালান্স পাবেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তার ব্যবহার অভ্যাস, রিচার্জের ইতিহাস, পরিশোধের রেকর্ড, দীর্ঘদিনের গ্রাহক সম্পর্ক, আয়ের অবদান এবং ঝুঁকি বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিটিআরসির সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগ জানিয়েছে, জরুরি ব্যালান্স দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহক সহায়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হিসেবে চালু রয়েছে। ২০০ টাকা পর্যন্ত বিদ্যমান ফি কাঠামো নিয়ে অপারেটরগুলোর মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য থাকলেও ২০০ থেকে ৫০০ টাকার সীমার ক্ষেত্রে ফি এবং গ্রাহক নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জরুরি ব্যালান্সের সীমা বাড়ানো হলে গ্রাহকরা প্রয়োজনের সময় আরও বেশি সুবিধা পাবেন। তবে একই সঙ্গে অপারেটরদের আর্থিক ঝুঁকি এবং গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত চার্জের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। তাই বিটিআরসির বিস্তারিত পর্যালোচনার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।

