দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কের মান উন্নয়ন এবং কভারেজ বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। মোবাইল অপারেটরদের জন্য নিম্ন ব্যান্ডের ই-জিএসএম স্পেকট্রামের নিলামের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি।
বিটিআরসি সীমিত হস্তক্ষেপযুক্ত একটি ই-জিএসএম স্পেকট্রাম ব্লকের জন্য প্রতি মেগাহার্টজের ভিত্তিমূল্য ২১৪ কোটি টাকা প্রস্তাব করেছে। এই ধরনের নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সির স্পেকট্রাম মোবাইল নেটওয়ার্কের কভারেজ বাড়াতে এবং ঘরের ভেতরে সংযোগের মান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ ছাড়া বেশি হস্তক্ষেপযুক্ত আরেকটি স্পেকট্রাম ব্লকের জন্য প্রতি মেগাহার্টজের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭৮ কোটি টাকা।
নিলাম আয়োজনের আগে প্রস্তাবিত দাম অনুমোদনের জন্য সরকারের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিটিআরসি। চলতি বছরেই এই নিলাম আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির।
নতুন স্পেকট্রাম বরাদ্দ হলে মোবাইল ব্যবহারকারীরা উন্নত নেটওয়ার্ক সুবিধা পেতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কে চাপ বেশি, সংযোগ দুর্বল অথবা কাভারেজ সীমিত, সেখানে অতিরিক্ত স্পেকট্রাম ব্যবহারের মাধ্যমে সেবার মান বাড়ানো সম্ভব হবে।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, মোট ৮ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ ই-জিএসএম স্পেকট্রাম নিলামের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
এর মধ্যে ৩ দশমিক ৪ মেগাহার্টজের একটি ব্লকের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি মেগাহার্টজ ২১৪ কোটি টাকা। এই মূল্য ১৫ বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে। একই ব্যান্ডের আগের নির্ধারিত মানদণ্ডের দাম ছিল ২৩৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ নতুন প্রস্তাবে প্রায় ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
অন্যদিকে ৫ মেগাহার্টজের আরেকটি ব্লকের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি মেগাহার্টজ ১৭৮ কোটি টাকা। এই ব্লকের ক্ষেত্রে আগের তুলনামূলক মূল্যের চেয়ে ২৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে।
বিটিআরসি জানিয়েছে, দুই ধরনের স্পেকট্রামের মধ্যে দামের পার্থক্যের মূল কারণ হলো প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিবেশী দেশের সিগন্যালের কারণে তৈরি হওয়া হস্তক্ষেপ।
প্রস্তাবিত ৩ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ ব্লকের ফ্রিকোয়েন্সি পরিসর হলো ৮৮৫ থেকে ৮৮৮ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ এবং ৯৩০ থেকে ৯৩৩ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ।
অন্যদিকে ৫ মেগাহার্টজ ব্লকের ফ্রিকোয়েন্সি পরিসর হলো ৮৮০ থেকে ৮৮৫ মেগাহার্টজ এবং ৯২৫ থেকে ৯৩০ মেগাহার্টজ।
বিটিআরসির মতে, দ্বিতীয় ব্লকটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিবেশী ভারতের সিগন্যালের কারণে বেশি সমস্যার মুখে পড়ে। ফলে এটি প্রথম ব্লকের মতো কার্যকরভাবে সারা দেশে ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
এই প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং স্বল্প সময়ের বরাদ্দ বিবেচনায় নিয়ে দাম কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
বর্তমানে মোবাইল নেটওয়ার্কের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের চাপ। ভিডিও দেখা, অনলাইন কাজ, ডিজিটাল সেবা ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে মোবাইল ডেটার চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত নিম্ন ব্যান্ডের স্পেকট্রাম অপারেটরদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ সাধারণত বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে এবং ভবনের ভেতরে তুলনামূলক ভালো সংযোগ দিতে সক্ষম।
বিটিআরসি জানিয়েছে, নিলামের নিয়ম, দরপত্র প্রক্রিয়া, দর বৃদ্ধির ধাপ, স্পেকট্রামের মেয়াদ, অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি, আবেদন ফি, জামানত এবং বার্ষিক স্পেকট্রাম ফি নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত স্পেকট্রামের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত সীমিত থাকবে। এরপর প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই ব্যান্ডের স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে যাওয়া হবে।
বিটিআরসি জানিয়েছে, বর্তমানে বিবেচনায় থাকা ১০ মেগাহার্টজ ই-জিএসএম ব্যান্ডের মধ্যে ১ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ ইতোমধ্যে রবি আজিয়াটা পিএলসিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাকি ৮ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ এখন নিলামের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই নিলামের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একাধিক মোবাইল অপারেটর একই স্পেকট্রাম ব্লকের প্রতি আগ্রহ দেখানোর পর নিলামের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং অর্থ বিভাগের সঙ্গে আলোচনার পর বিটিআরসি এই মূল্য প্রস্তাব করেছে। অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, স্পেকট্রামের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ বিটিআরসির নিজস্ব আইনগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
অর্থ বিভাগের মতামত অনুযায়ী, যেহেতু প্রকৃত মূল্য প্রতিযোগিতামূলক নিলামের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, তাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রযুক্তিগত বিষয় বিবেচনায় নিয়ে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণে তাদের আপত্তি নেই।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণ বিটিআরসির এখতিয়ারের মধ্যে পড়লেও প্রক্রিয়াটিকে আরও স্বচ্ছ রাখতে সরকারিভাবে অনুমোদন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন স্পেকট্রাম বরাদ্দ শুধু মোবাইল অপারেটরদের সক্ষমতা বাড়াবে না, বরং গ্রাহকদের জন্য আরও স্থিতিশীল কল সেবা ও উন্নত মোবাইল ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের ব্যস্ত এলাকাগুলোতে নেটওয়ার্ক চাপ কমানো এবং ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটাতে এই নতুন স্পেকট্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন অপেক্ষা নিলাম প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার এবং অপারেটররা কীভাবে এই অতিরিক্ত স্পেকট্রাম ব্যবহার করে সেবার মান উন্নত করে তার ওপর।

