সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের পোস্টে অশালীন ও হেনস্তামূলক মন্তব্যের ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। এসব মন্তব্যের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন অনেক নারী। এমন পরিস্থিতিতে অনলাইনে নারীদের হেনস্তাকারীদের পরিচয় সামনে আনতে কাজ করছে ফেসবুকভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘নো মোর সাইলেন্স’।
গত বছরের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করা গ্রুপটির সদস্য সংখ্যা এখন ৫০ হাজারের বেশি। গ্রুপ সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জনের পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৫ থেকে ২০ জনের ক্ষেত্রে কর্মস্থলে যোগাযোগ করা হয়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বা সতর্ক করার ঘটনা ঘটেছে।
গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা আবির আহম্মেদ পিয়াস জানান, বিভিন্ন গণমাধ্যম, তারকা ও ইনফ্লুয়েন্সারদের পোস্টে আপত্তিকর মন্তব্যকারীদের প্রকাশ্য তথ্য ও মন্তব্যের স্ক্রিনশট যাচাই করে পরিচয় প্রকাশ করা হয়। পরবর্তী সময়ে গ্রুপের সদস্যরাও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মস্থলে ইমেইলের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে শুরু করেন। তবে ফেক আইডির ক্ষেত্রে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন বলে জানান তিনি।
তবে অভিযোগকারীদের পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে ভুল তথ্য ও নিরপরাধ ব্যক্তির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা স্বীকার করেছেন, ফেসবুক প্রোফাইলের তথ্যের ওপর নির্ভর করে একবার ভুল কর্মস্থলের পরিচয় প্রকাশের ঘটনা ঘটেছিল। এরপর থেকে যাচাই প্রক্রিয়া আরও সতর্ক করার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়,অভিনেত্রী প্রিয়ন্তী উর্বীও অনলাইনে হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। ইউরোপ ভ্রমণের ভিডিও প্রকাশের পর তাঁর পোস্টে অশালীন মন্তব্য করা হয়। পরে ৪০ থেকে ৫০টি আইডি ব্লক করার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানান তিনি।
প্রথম আলো ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০২০ সালের ২১ থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত অনলাইনে একটি জরিপ পরিচালনায় প্রকাশ করে,ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের ৭৯ শতাংশের বেশি কখনো না কখনো অনলাইন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। জরিপে নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ অপমানজনক ও আপত্তিকর মন্তব্যের শিকার হওয়ার তথ্য উঠে আসে।
দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় কোনো নারীর শালীনতা বা মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে শব্দ, অঙ্গভঙ্গি বা কোনো কিছু প্রদর্শনের মাধ্যমে অপমান করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ ধারায় এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর ২৫ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত উপাদান বা সেক্সটর্শনের উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর বা ভীতিপ্রদ উপাদান প্রকাশের বিষয়ে শাস্তির বিধান আছে। এ ধারায় নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হলে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশে সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, ভুয়া পরিচয়ে মানহানি, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার এবং অনলাইন চরিত্রহননের মতো ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীকেই সামাজিক চাপ, দোষারোপ ও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়।তাই ভুক্তভোগীরা কোনো পদক্ষেপ নিতে চান না।
ডেইলি স্টার এর প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়,আইনজীবী তাসমিয়া নুহিয়া আহমেদ মনে করেন, ‘নো মোর সাইলেন্স’-এর মতো উদ্যোগ অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে সচেতনতা ও সহায়তা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অভিযোগ প্রকাশের আগে তথ্যপ্রমাণ যাচাই, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া জরুরি। অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে পোস্ট সরানো ও প্রকাশ্যে ভুল সংশোধনের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।
অনলাইনে নারীদের হেনস্তা বন্ধে প্রতিবাদের পাশাপাশি আইনি প্রতিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে যেন ভুল পরিচয় প্রকাশ বা সামাজিকভাবে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার মাধ্যমে নতুন অন্যায় তৈরি না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

