ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবসা এক ছাতার নিচে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তাঁর দুই প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স ও টেসলা সম্ভাব্য একীভূতকরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করতে পৃথক বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর স্পেসএক্সের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল নিয়ে আলোচনায় মাস্ক এ তথ্য জানান। দুই প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণ বাস্তবে রূপ নিলে এটি বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় করপোরেট মার্জার হতে পারে। তবে এখনো চুক্তির শর্ত চূড়ান্ত হয়নি, এমনকি দুই প্রতিষ্ঠান এক হবে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।
স্পেসএক্সের মূল ব্যবসা রকেট উৎক্ষেপণ ও স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা। অন্যদিকে টেসলা পরিচিত বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং রোবট তৈরির পরিকল্পনার জন্য। বাইরে থেকে দেখলে প্রতিষ্ঠান দুটির ব্যবসা আলাদা মনে হতে পারে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার সেই ব্যবধান কমিয়ে আনছে। চালকবিহীন গাড়ি চালাতে যেমন উন্নত সফটওয়্যার, চিপ ও বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা দরকার, তেমনি মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগ ও ভবিষ্যতের তথ্যকেন্দ্র পরিচালনাতেও এসব প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে।
মাস্কের যুক্তি হলো, প্রতিষ্ঠান দুটি একসঙ্গে কাজ করলে অতি উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফটওয়্যার তৈরিতে সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ, এখানে শুধু দুটি কোম্পানির মালিকানা এক করার প্রশ্ন নয়, বরং প্রযুক্তি, অর্থ ও অবকাঠামোকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ও রোবট তৈরির অভিজ্ঞতা অন্যটির মহাকাশ ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হলে নতুন পণ্য কিংবা সেবা তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সম্ভাব্য এসব সুবিধা বাস্তবে কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করবে একীভূতকরণের ধরন ও পরবর্তী ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের ওপর।
বাজারমূল্যের হিসাবে প্রস্তাবিত একীভূতকরণের ব্যাপ্তি বিশাল। সাম্প্রতিক বাজারমূল্যের হিসাব অনুযায়ী, স্পেসএক্সের মূল্য প্রায় ২ লাখ কোটি ডলার এবং টেসলার মূল্য প্রায় দেড় লাখ কোটি ডলার। অর্থাৎ, দুটি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি ডলারের কাছাকাছি। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের সঙ্গে তুলনা করলে এই অঙ্কের বিশালতা আরও স্পষ্ট হয়। তবে বাজারমূল্য মানেই প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা নগদ অর্থ নয়। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও মুনাফার যে প্রত্যাশা করেন, বাজারমূল্যে তারও প্রতিফলন থাকে। তাই এই দুই প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বাজারমূল্যকে সরাসরি একীভূতকরণের খরচ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
স্পেসএক্সের সাম্প্রতিক আর্থিক ফলাফলও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রায় ১ হাজার ৪৬০ কোটি ডলার আয় করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬১ শতাংশ বেশি। এ সময়ে মুনাফা হয়েছে প্রায় ৪৪০ কোটি ডলার। এআই ব্যবসার সম্প্রসারণ এই প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে, স্পেসএক্সের স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক এখনো মুনাফার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে স্পেসএক্সের হাতে মহাকাশ প্রযুক্তি ও যোগাযোগ অবকাঠামোর পাশাপাশি দ্রুত বাড়তে থাকা এআই ব্যবসাও রয়েছে। টেসলার গাড়ি, ব্যাটারি ও রোবট প্রযুক্তির সঙ্গে এই সক্ষমতা যুক্ত করার সম্ভাবনাই মার্জারের আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে প্রবেশও এই সম্ভাব্য চুক্তির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালের জুনে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে প্রায় ৮৫৭০ কোটি ডলার সংগ্রহ করে। এর ফলে স্পেসএক্সের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য বড় অঙ্কের মূলধন এসেছে এবং প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার বাজারে লেনদেন শুরু হয়েছে। তবে এই অর্থ সংগ্রহের বিষয়টিকে টেসলাকে কিনে নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। স্পেসএক্সের আইপিওসংক্রান্ত ঘোষণায় অর্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্য হিসেবে এআই কম্পিউটিং অবকাঠামো, রকেট উৎক্ষেপণব্যবস্থা এবং স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, সম্ভাব্য মার্জারের আর্থিক সামর্থ্য নিয়ে আলোচনা করা গেলেও এই অর্থ দিয়েই চুক্তি সম্পন্ন হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সম্ভাব্য চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো স্বার্থের সংঘাত। মাস্ক একই সঙ্গে স্পেসএক্স ও টেসলার প্রধান নির্বাহী। দুই প্রতিষ্ঠান একীভূত হলে কোন কোম্পানির শেয়ারধারীরা কী শর্তে নতুন প্রতিষ্ঠানের মালিক হবেন, সম্পদের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, সেসব প্রশ্ন সামনে আসবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দুই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সব সময় এক নাও হতে পারে। তাই কমিটিগুলোতে স্বাধীন পরিচালকদের রাখা হয়েছে এবং মাস্ক জানিয়েছেন, নিজের স্বার্থ জড়িত থাকায় তিনি এসব আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন না। দুই কমিটি এখনো চুক্তির শর্তে একমত হয়নি।
এখানে শেয়ারধারীদের অনুমোদনও বড় বিষয়। মাস্কের বক্তব্য অনুযায়ী, টেসলার ক্ষেত্রে মোট শেয়ারধারীদের অন্তত ৫০ শতাংশের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ফলে দুই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা একমত হলেই চুক্তি কার্যকর হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। শেয়ারধারীদের কাছে প্রস্তাবটির গ্রহণযোগ্যতা, দুই প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন এবং চুক্তির শর্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। পাশাপাশি এত বড় একীভূতকরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যালোচনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাজারে খবরটি আসার পর স্পেসএক্স ও টেসলা দুই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দামই বেড়েছে। তবে শেয়ারের এই প্রতিক্রিয়াকে সম্ভাব্য চুক্তির অনুমোদন বা সফলতার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা, নতুন প্রযুক্তির সুযোগ কিংবা বড় ব্যবসায়িক পরিবর্তনের প্রত্যাশায় শেয়ার কেনেন। পরে চুক্তির শর্ত, ব্যয় বা ঝুঁকি স্পষ্ট হলে সেই প্রত্যাশা বদলেও যেতে পারে।
মাস্ক নিজেও একীভূতকরণকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখতে নিষেধ করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, দুই প্রতিষ্ঠানকে এক করার পক্ষে যুক্তি থাকলেও চুক্তি হবেই, এমন ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু রকেট ও গাড়ির ব্যবসা এক করার নয়। বরং এআই, রোবট, জ্বালানি, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং মহাকাশ প্রযুক্তিকে ঘিরে ভবিষ্যতের ব্যবসা কোন কাঠামোয় পরিচালিত হবে, সেটিও এর সঙ্গে জড়িত। সম্ভাব্য মার্জার বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবসায় নতুন এক শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরি হতে পারে। কিন্তু তার আগে মূল্যায়ন, শেয়ারধারীদের সম্মতি এবং চুক্তির শর্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাধা পেরোতে হবে।

