দেশে দ্বিতীয় প্রজন্মের (টু-জি) মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এ জন্য ২০২৯ সালের ডিসেম্বরকে লক্ষ্য ধরে একটি রোডম্যাপ তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাশ্রয়ী দামের বিকল্প ফোনের অভাব। দেশে এখনো সাড়ে ছয় কোটির বেশি গ্রাহক বাটন ফোন ব্যবহার করেন, যার বেশির ভাগই টু-জি প্রযুক্তিনির্ভর।
টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে এসব গ্রাহককে নতুন ফোন কিনতে হবে। তাই নেটওয়ার্ক পরিবর্তনের আগে কম দামে উপযোগী ফোনের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মোবাইল অপারেটর, ফোন উৎপাদনকারী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরকে সম্ভাব্য লক্ষ্য ধরে টু-জি বন্ধের রোডম্যাপ তৈরির প্রস্তাব করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের অনুমোদন নিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। অনুমোদন পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিটিআরসির হিসাবে, দেশে মোবাইল ফোন সংযোগের সংখ্যা প্রায় ১৯ কোটি। এর মধ্যে সাড়ে ছয় কোটির বেশি গ্রাহক ফিচার ফোন বা বাটন ফোন ব্যবহার করেন। এসব ফোনের অধিকাংশই টু-জি নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল।
মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) সভাপতি যাকারিয়া শহীদ জানান, বাজারে একটি সাধারণ বাটন ফোনের দাম ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ফোরজি-সমর্থিত ফিচার ফোন কিংবা সবচেয়ে কম দামের স্মার্টফোন কিনতে খরচ হয় প্রায় ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা। ফলে নতুন ফোন কেনার বাড়তি ব্যয় নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য বড় সমস্যা হতে পারে।
তাঁর মতে, প্রথম বছরে কতজন গ্রাহক ফোন পরিবর্তন করেন, তা পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী পরিকল্পনা করা উচিত। প্রথম বছরেই প্রায় এক কোটি গ্রাহক ফোন বদলালে তিন বছরের মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির প্রসারে মেমোরি চিপের চাহিদা ও দাম বাড়ছে। এতে কম খরচে স্মার্টফোন উৎপাদন করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
শুধু ফোন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই টু-জি বন্ধের পরিকল্পনা সফল হবে না বলে মনে করেন যাকারিয়া শহীদ। তাঁর মতে, প্রথমে গ্রাহকের চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাজার তৈরি করতে হবে। এরপর উৎপাদনকারীদের লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।
বাজারে পর্যাপ্ত চাহিদা তৈরি না করে উৎপাদনকারীদের ফোন তৈরিতে বাধ্য করা হলে প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানে পড়তে পারে। অতীতেও এ ধরনের উদ্যোগে কোম্পানিগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ কারণে সরকারকে মোবাইল অপারেটর, ফোন উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে দায়িত্ব ভাগ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও নিশ্চিত করতে হবে।
দেশে কম দামে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ আগে চার হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণের কথা জানিয়েছিলেন। পরে যন্ত্রাংশের দামসহ বিভিন্ন কারণে সেই লক্ষ্য পাঁচ হাজার টাকায় পুনর্নির্ধারণের কথা বলা হয়।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৩ কোটি ২৮ লাখ মোবাইল ফোন উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ২ কোটি ১২ লাখের বেশি ছিল টু-জি ফিচার ফোন, যা মোট উৎপাদনের ৬৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ ফোন উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি ছিল টু-জি ফিচার ফোন। এ সময়ে মোট উৎপাদনের ৬৬ দশমিক ২৩ শতাংশ ছিল টু-জি ফোন।
স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফোন তৈরির জন্য আমদানি করা ২২ ধরনের কাঁচামালের ওপর অগ্রিম আয়কর কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। স্থানীয় উৎপাদনকারীদের জন্য শুল্ক ও শর্তসাপেক্ষে মূল্য সংযোজন করের ছাড়ও ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
পাশাপাশি গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে ভর্তুকিতে স্মার্টফোন সরবরাহ, কিস্তিতে ফোন কেনার সুযোগ, সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল ব্যবহার এবং কর-শুল্ক কমানোর মতো প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। কম দামের ভোল্টিই-সমর্থিত ফিচার ফোনের সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টিও ভাবা হচ্ছে।
বিটিআরসির প্রস্তাবে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের জন্য তিনটি সম্ভাব্য সময়সীমা বিবেচনা করা হয়েছে। দ্রুত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ২০২৯ সাল, মাঝারি গতির ক্ষেত্রে ২০৩০ সাল এবং ধীরগতির ক্ষেত্রে ২০৩২ সালকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে রাখা হয়েছে। কমিশন ২০২৯ সালের ডিসেম্বরকে লক্ষ্য ধরে এগোনোর প্রস্তাব করেছে। তবে ২০২৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে অগ্রগতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
টু-জি বন্ধের পরিকল্পনা নিয়ে বিটিআরসি ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর কাজ শুরু করে। এর আগে একই বছরের ২৮ আগস্ট মোবাইল ফোন উৎপাদনকারীদের সঙ্গে বৈঠকে শুধু টু-জি-সমর্থিত ফিচার ফোন সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় আমদানির অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে অপারেটর, উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা করে নেটওয়ার্ক বন্ধের ঝুঁকি এবং গ্রাহকদের নতুন প্রযুক্তিতে স্থানান্তরের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়।
পরিকল্পনায় শুধু টু-জি ফোনের আমদানি, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ধাপে ধাপে বন্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি টু-জি-নির্ভর যন্ত্রপাতি ও সেবার তালিকা তৈরি এবং গ্রাহকদের আগেভাগে এ বিষয়ে জানানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিটিআরসির ২৫টি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে চালানো জরিপে দেখা গেছে, দোকানে নতুন করে আনা ১০০টি টু-জি ফোন বিক্রি করতে সাধারণত দুই থেকে চার মাস সময় লাগে। একজন গ্রাহক গড়ে দেড় থেকে দুই বছর একটি টু-জি ফোন ব্যবহার করেন। তবে ফোন পরিবর্তন ও বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিকল্পনায় আড়াই বছরের ব্যবহারকাল ধরে হিসাব করার কথা বলা হয়েছে।
টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে এ প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত তরঙ্গের একটি অংশ ফোরজি এবং ভবিষ্যতে ফাইভজি সেবায় ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। এতে অপারেটররা বিদ্যমান তরঙ্গ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করে ফোরজি নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়াতে পারবেন। ফলে ইন্টারনেটের গতি ও সেবার মান উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে।
ফোরজি নেটওয়ার্কে ভোল্টিই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে উন্নত মানের ভয়েস কল দেওয়াও সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পুরোনো নেটওয়ার্কের যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কমতে পারে। তবে এসব সুবিধা পেতে তরঙ্গ পুনর্বণ্টন, নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এবং গ্রাহকদের উপযোগী ফোনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
রবি আজিয়াটা লিমিটেডের প্রধান করপোরেট ও নিয়ন্ত্রকবিষয়ক কর্মকর্তা শাহেদ আলম বলেন, তাঁরা টু-জি বন্ধের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। পুরোনো নেটওয়ার্ক সরিয়ে নেওয়া হলে ফোরজি সেবায় তরঙ্গ বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে গ্রাহকেরা আরও উন্নত মোবাইল সেবা পেতে পারেন।
বাংলাদেশের মতো ভারত ও পাকিস্তানেও টু-জি নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধের নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ভারতে ২০২৪ সালে টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে দেওয়া একটি প্রস্তাবে স্বল্প আয়ের গ্রাহকদের সহায়তা ছাড়া টু-জি ও থ্রিজি বন্ধে বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ না করার সুপারিশ করা হয়েছিল।
পাকিস্তানেও ২০২৬ সালের মে মাসে ৫৭ হাজারের বেশি টু-জি বেস স্টেশন চালু ছিল। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুরে ২০১৭ সালে ধাপে ধাপে টু-জি সেবা বন্ধ করা হয়। সুইজারল্যান্ডে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অপারেটররা পর্যায়ক্রমে এই নেটওয়ার্ক সরিয়ে নেয়। ভিয়েতনামেও পুরোনো নেটওয়ার্ক বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশটিতে ২০২৪ সালে শুধু টু-জি ফোনে সেবা বন্ধের প্রথম ধাপ শুরু হয় এবং ২০২৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে টু-জি বন্ধের সময়সীমা কার্যকর হয়।
দেশে ফোরজি নেটওয়ার্কের আওতা বাড়লেও মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার এখনো তুলনামূলক কম। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ ফোরজি নেটওয়ার্কের আওতায় থাকলেও মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করেন প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, টু-জি বন্ধের আগে সাশ্রয়ী ফোরজি ও ভোল্টিই-সমর্থিত ফোন, নির্ভরযোগ্য ভয়েস সেবা এবং গ্রাহকদের জন্য প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, ডিজিটাল সেবায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ফল হিসেবে টু-জি বন্ধ হওয়া উচিত; এটি যেন ডিজিটাল সেবায় অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত না হয়ে দাঁড়ায়।
খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, টু-জি বন্ধের আগে শুধু সাধারণ গ্রাহকদের ফোন পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করলেই হবে না। স্মার্ট মিটার, যানবাহন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, বিক্রয়কেন্দ্রের লেনদেনযন্ত্র, নিরাপত্তা অ্যালার্ম এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতিও টু-জি নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে। এসব ব্যবস্থাকে নতুন প্রযুক্তিতে স্থানান্তর না করে নেটওয়ার্ক বন্ধ করলে সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিটিআরসির পরিকল্পনায় মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া, গ্রাহকদের নিয়মিত বার্তার মাধ্যমে জানানো, প্রয়োজনে সিম পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা এবং যাঁদের পক্ষে নতুন ফোন কেনা কঠিন, তাঁদের সহায়তা দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। নেটওয়ার্ক বন্ধের আগে জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোর প্রস্তুতিও যাচাই করার কথা বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, টু-জি বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নির্ধারিত সময়সীমার পাশাপাশি গ্রাহকদের আর্থিক সামর্থ্য, সাশ্রয়ী ফোনের সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির প্রযুক্তি পরিবর্তন নিশ্চিত করা জরুরি। এসব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেই পুরোনো নেটওয়ার্ক থেকে নতুন প্রযুক্তিতে স্থানান্তর তুলনামূলক নির্বিঘ্ন করা সম্ভব হবে।

