অ্যানথ্রপিকের নিজস্ব ঘোষণায় জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মিথ্রিল মেডিসিন অধিগ্রহণ করে। তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে ২৭ অক্টোবর। স্টার্টআপটির প্রতিষ্ঠাতা কোডি ট্রানবার্গার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ‘প্রফেসর ওক’ নামে পরিচিত ছিলেন। পরে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে তিনি জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি এখন অ্যানথ্রপিকের অংশ। অধিগ্রহণের আর্থিক মূল্য প্রকাশ করা হয়নি।
প্রায় ১৮ মাস আগে বিরল জিনগত রোগের সম্ভাব্য চিকিৎসা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে মিথ্রিল মেডিসিন প্রতিষ্ঠা করেন ট্রানবার্গার। প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি ছিলেন একমাত্র পূর্ণকালীন কর্মী। তবে একা কাজ করলেও গবেষণার জন্য তাঁর সহায়তা ছিল বিভিন্ন পরামর্শক ও বাইরের পরীক্ষাগার থেকে। অ্যানথ্রপিকের তথ্য অনুযায়ী, মোট ১১টি বাইরের পরীক্ষাগারের সঙ্গে গবেষণার কাজ সমন্বয় করতে তিনি ক্লড ব্যবহার করেছেন।
গবেষণার পরিকল্পনা তৈরি, পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ, চুক্তিপত্র ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষাগারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং কোন কাজ কোথায় আটকে আছে তা শনাক্ত করার মতো কাজে এআই সহায়তা করেছে। একাধিক পরীক্ষাগারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য আসার পর সেগুলো একত্র করা এবং সম্ভাবনাময় ফলগুলো বাছাই করতেও ক্লড ব্যবহার করা হয়েছে। এতে একজন গবেষকের পক্ষে তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরের দল নিয়ে একাধিক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে।
তবে এখানে এআইয়ের ভূমিকা নিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। ক্লড একাই গবেষণা করে ওষুধ তৈরি করেনি। গবেষণার বৈজ্ঞানিক দিকনির্দেশনা, পরীক্ষার সিদ্ধান্ত এবং ফলাফল মূল্যায়নের দায়িত্ব মানুষেরই ছিল। এআই মূলত গবেষণার প্রশাসনিক ও বিশ্লেষণমূলক কাজ সহজ করেছে, আর বাস্তব পরীক্ষা চালানো হয়েছে বাইরের পরীক্ষাগারগুলোতে।
মিথ্রিল মেডিসিন বিরল পেশির রোগের দুটি ধরন নিয়ে কাজ করছে। এর একটি হলো লামা২ জিনের সঙ্গে সম্পর্কিত জন্মগত মাসকুলার ডিস্ট্রফি বা এলএএমএ২-সিএমডি। এ রোগে পেশির তন্তুকে ঘিরে থাকা প্রোটিনের সংযোগ দুর্বল হয়ে যায়। ফলে পেশি সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সময়ের সঙ্গে পেশির শক্তি কমতে থাকে। এ রোগের কার্যকর অনুমোদিত চিকিৎসা এখনো নেই।
এই সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে গবেষকেরা বিশেষ ধরনের অ্যান্টিবডি ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। অ্যান্টিবডিগুলোর কাজ হবে পেশির তন্তু ও তার চারপাশের প্রোটিন স্তরের মধ্যে দুর্বল হয়ে যাওয়া সংযোগকে আবার শক্তিশালী করা। ধারণাটি কার্যকর হলে পেশির ক্ষতি কমানো এবং পেশির কার্যক্ষমতা উন্নত করার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গুরুতর রোগের একটি ধরন নিয়ে তৈরি করা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় সর্বোচ্চ মাত্রায় অ্যান্টিবডি চিকিৎসা পাওয়া ইঁদুরের মুঠির শক্তি ও ট্রাইসেপস পেশির বল চিকিৎসা না পাওয়া ইঁদুরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল। পরীক্ষায় চিকিৎসা পাওয়া ইঁদুরের বেঁচে থাকার হারেও উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এই ফল গবেষণাটির সম্ভাবনা তুলে ধরলেও একে রোগটির চিকিৎসা আবিষ্কারের চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যাবে না।
পরীক্ষার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ইঁদুরগুলোকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে বিভিন্ন দলে ভাগ করা হয়নি, সব পরীক্ষা একই সময়ে পরিচালিত হয়নি এবং গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে ইঁদুরের দলও পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে ফলাফল ব্যাখ্যা করতে সতর্কতা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইঁদুরের শরীরে কোনো চিকিৎসা কার্যকর মনে হওয়া মানেই মানুষের শরীরেও তা একইভাবে কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মানুষের শরীরে চিকিৎসাটির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাই করতে আরও গবেষণা এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন।
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক থাকলে এলএএমএ২-সিএমডির সম্ভাব্য ওষুধ ২০২৮ সালের শেষ দিকে মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরুর উপযোগী হতে পারে। অন্য রোগটির জন্যও সম্ভাব্য ওষুধ তৈরির কাজ চলছে। তবে এগুলো গবেষণার লক্ষ্যমাত্রা, নিশ্চিত সময়সূচি নয়। পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না এলে ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়া পিছিয়ে যেতে পারে বা পুরো পরিকল্পনাই পরিবর্তন করতে হতে পারে।
মিথ্রিল মেডিসিন অধিগ্রহণের মধ্য দিয়ে অ্যানথ্রপিক শুধু অন্য প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় এআই ব্যবহারে সহায়তা করার বাইরে গিয়ে নিজস্ব ওষুধ আবিষ্কারের কর্মসূচিও শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ওষুধ তৈরি করতে শুধু একটি কার্যকর অণু খুঁজে পেলেই হয় না। গবেষণার লক্ষ্য নির্বাচন, অণুর নকশা, পরীক্ষাগারের কাজ সমন্বয়, উৎপাদনযোগ্যতা যাচাই এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রস্তুতিসহ অনেক ধাপ পেরোতে হয়। এসব কাজে সময় ও অর্থের চাপ কমানো গেলে বিরল রোগের চিকিৎসা নিয়ে গবেষণাও তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।
তবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য শুধু গবেষণার গতি দিয়ে বিচার করা যাবে না। শেষ পর্যন্ত সম্ভাব্য ওষুধ মানুষের শরীরে নিরাপদ কি না এবং রোগীর উপকারে আসে কি না, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা। আপাতত মিথ্রিল মেডিসিনের গবেষণা দেখাচ্ছে, এআই একজন গবেষককে অনেক কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সম্ভাবনাময় গবেষণাকে কার্যকর চিকিৎসায় পরিণত করতে যে বৈজ্ঞানিক যাচাই ও দীর্ঘ পরীক্ষার প্রয়োজন, তা এআইও এড়িয়ে যেতে পারবে না।

