অফিসের কাজ, তথ্য সংগ্রহ, প্রতিবেদন তৈরি কিংবা দৈনন্দিন কাজের চাপ কমাতে বাংলাদেশের কর্মীদের মধ্যে বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার। এখন দেশের বেসরকারি খাতের জরিপে অংশ নেওয়া ৫৫ শতাংশ কর্মী প্রতিদিনের কাজে এআই ব্যবহার করছেন। তাঁদের মধ্যে ৯১ শতাংশ মনে করেন, এই প্রযুক্তি তাঁদের কাজের অভিজ্ঞতায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। তবে কর্মীদের আগ্রহের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া বা প্রয়োজনীয় সুযোগ নিশ্চিত করছেন মাত্র ৫৮ শতাংশ নিয়োগদাতা। অর্থাৎ কর্মীরা নিজের উদ্যোগে প্রযুক্তি গ্রহণ করলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতিতে এখনো ঘাটতি রয়েছে।
মেটলাইফ বাংলাদেশের দ্বিতীয় ‘এমপ্লয়ি বেনিফিটস ট্রেন্ডস স্টাডি (ইবিটিএস) ২০২৬’-এ এ চিত্র উঠে এসেছে। গত আগস্টে পরিচালিত এই গবেষণায় বিভিন্ন খাতের ৭০৯ জন অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ৫৮৩ জন পূর্ণকালীন কর্মী এবং ১২৬ জন নিয়োগকর্তা বা কর্মীদের সুযোগ সুবিধা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা। তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং, উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ, খুচরা ব্যবসা, তথ্যপ্রযুক্তি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।
এআই ব্যবহারের পেছনে কর্মীদের আগ্রহের কারণ শুধু নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কৌতূহল নয়। দৈনন্দিন কাজে এমন অনেক কাজ থাকে, যেগুলো করতে সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লাগে। যেমন তথ্য খুঁজে বের করা, বড় কোনো নথির সারসংক্ষেপ তৈরি, হিসাব বিশ্লেষণ কিংবা নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ। এসব ক্ষেত্রে এআই সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে কর্মীরা তুলনামূলক কম সময়ে কাজ শেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পান।
মেটলাইফের গবেষণাতেও এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এআই ব্যবহারকারীদের ৫৪ শতাংশ জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তি তাঁদের কাজসংক্রান্ত মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করছে। প্রায় ৪৮ শতাংশ মনে করেন, এআই ব্যবহারে তাঁদের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। অন্যদিকে, ৪০ শতাংশ কর্মীর মতে, এআই গতানুগতিক কাজের চাপ কমিয়ে তাঁদের আরও অর্থবহ ও সৃজনশীল কাজে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। অর্থাৎ কর্মীদের কাছে এআই শুধু কাজ সহজ করার প্রযুক্তি নয়, বরং কাজের সময় ও মনোযোগ ব্যবহারের ধরন বদলে দেওয়ার একটি উপায় হয়ে উঠছে।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। এগুলো কর্মীদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মতামতভিত্তিক ফলাফল। অর্থাৎ এআই ব্যবহারের কারণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাস্তবে কত শতাংশ উৎপাদনশীলতা বেড়েছে, গবেষণাটি সেই হিসাব দেয়নি। বরং কর্মীরা প্রযুক্তিটি ব্যবহারের পর কী ধরনের সুবিধা অনুভব করছেন, সেটিই তুলে ধরেছে।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মী ও নিয়োগদাতাদের মধ্যে এআই নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। যেখানে জরিপে অংশ নেওয়া ৫৫ শতাংশ কর্মী প্রতিদিনের কাজে এআই ব্যবহার করছেন, সেখানে মাত্র ৫৮ শতাংশ নিয়োগদাতা তাঁদের প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছেন বা প্রয়োজনীয় সুযোগ তৈরি করেছেন। আবার যেসব প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারে উৎসাহ বা সুযোগ রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগদাতাদের মাত্র ৩৭ শতাংশ মনে করেন, কর্মীরা সহজেই এই প্রযুক্তি গ্রহণ করছেন।
এই পার্থক্য থেকে একটি বিষয় বোঝা যায়। কর্মীরা ব্যক্তিগতভাবে এআই ব্যবহার করতে আগ্রহী হলেও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রযুক্তিটি ব্যবহারের জন্য আরও প্রস্তুতি প্রয়োজন। কারণ কর্মীর হাতে কোনো এআই টুল থাকা আর প্রতিষ্ঠানজুড়ে সেটি নিরাপদ ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, সঠিক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং কোন কাজে এআই ব্যবহার করা যাবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা।
বিশেষ করে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, টেলিযোগাযোগ কিংবা উৎপাদনশিল্পের মতো খাতে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ও ব্যবসায়িক নথি নিয়ে কাজ করতে হয়। সেখানে অনুমোদনহীন এআই টুলে সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহার করলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই শুধু কর্মীদের এআই ব্যবহারে উৎসাহ দিলেই হবে না, কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, সেটিও শেখাতে হবে।
গবেষণায় প্রযুক্তি ব্যবহারের ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি কর্মীদের আর্থিক চাপের বিষয়টিও উঠে এসেছে। বরং গত এক বছরে এই চাপ আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালে জরিপে অংশ নেওয়া ৫৬ শতাংশ কর্মী জানিয়েছিলেন, আর্থিক দুশ্চিন্তা তাঁদের কাজের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়। ২০২৬ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ শতাংশে।
এর অর্থ হলো, কর্মীরা অফিসে কাজ করলেও তাঁদের একটি বড় অংশের মনোযোগের সঙ্গে ব্যক্তিগত আর্থিক চিন্তা জড়িয়ে থাকছে। মাসের শেষে সংসারের খরচ মেটানো, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা ঋণের কিস্তি পরিশোধের চিন্তা কাজের সময়ও তাঁদের পিছু ছাড়ছে না। এ ধরনের চাপ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে কাজে মনোযোগ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ কারণে কর্মীরা এখন প্রতিষ্ঠান থেকে শুধু বেতন নয়, আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বাড়তি সহায়তাও প্রত্যাশা করছেন। গবেষণায় ৮১ শতাংশ কর্মী মনে করেন, তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নিয়োগদাতাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। এক বছর আগে এ হার ছিল ৬৯ শতাংশ। আবার ৮৬ শতাংশ কর্মী চান, তাঁদের অবসরজীবনের জন্য সঞ্চয় গড়ে তুলতেও প্রতিষ্ঠানগুলো সহায়তা করুক। আগের বছর এই হার ছিল ৬৭ শতাংশ।
কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে অবসর পরিকল্পনার হিসাবে। গবেষণায় ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী কর্মীদের মধ্যে ৮১ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের কোনো নির্দিষ্ট অবসরকালীন আর্থিক পরিকল্পনা নেই। ২০২৫ সালে একই বয়সী অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এই হার ছিল ৫৩ শতাংশ।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কর্মজীবনের একটি বড় সময় পার করার পরও যদি কেউ অবসরজীবনের জন্য সঞ্চয় বা নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা করতে না পারেন, তাহলে কর্মক্ষমতা হারানোর পর তাঁর আর্থিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষ করে আমাদের দেশে বেসরকারি খাতের সব প্রতিষ্ঠানে পেনশন বা অবসরকালীন সুবিধা সমানভাবে চালু নেই। ফলে চাকরি শেষ হওয়ার পর কীভাবে সংসারের খরচ চলবে, তা অনেকের জন্য অনিশ্চিত থেকে যায়।
এ কারণে কর্মীরা চান, প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু মাসিক বেতন দেওয়ার মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ না রেখে অবসরকালীন সঞ্চয়, বীমা ও জরুরি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও করুক। গবেষণায় ৭২ শতাংশ কর্মী বড় ধরনের অপ্রত্যাশিত আর্থিক সংকট বা ব্যয়ের সময় নিয়োগদাতার সহায়তা প্রত্যাশা করেছেন।
কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের প্রত্যাশা বদলানোর আরেকটি দিক হলো ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী সুযোগ সুবিধা পাওয়ার আগ্রহ। গবেষণায় নিজের প্রয়োজন ও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে মানানসই সুবিধা চান এমন কর্মীর হার ২০২৫ সালের ৬৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৮৬ শতাংশ হয়েছে। পাশাপাশি ৭৯ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বীমা ও সুস্থতাসংক্রান্ত সুবিধা পেলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁদের আনুগত্য বাড়বে।
নিয়োগদাতারাও বিষয়টি বুঝতে শুরু করেছেন। গবেষণায় ৮৫ শতাংশ নিয়োগদাতা মনে করেন, কর্মীদের সুযোগ সুবিধা একটি ইতিবাচক কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আগের বছর এ হার ছিল ৭৮ শতাংশ। গত এক বছরে প্রায় অর্ধেক নিয়োগদাতা কর্মীদের সুযোগ সুবিধা খাতে বিনিয়োগও বাড়িয়েছেন।
এদিকে সামগ্রিক চাকরিসন্তুষ্টির হারও বেড়েছে। ২০২৫ সালে যেখানে ৭৮ শতাংশ কর্মী তাঁদের চাকরি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন, ২০২৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৮৩ শতাংশ। তবে সন্তুষ্টি বাড়লেও আর্থিক দুশ্চিন্তা ও অবসরজীবনের অনিশ্চয়তা কমেনি। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে ভালো পরিবেশ থাকলেই কর্মীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
মেটলাইফ বাংলাদেশের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আলা আহমদ বলেন, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র শুধু নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের বিষয় নয়। কাজের ধরন বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মীরা যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা পান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, প্রযুক্তি, আর্থিক নিরাপত্তা, সুস্থতা ও কর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সুযোগ সুবিধা একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে আরও দক্ষ ও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব।
সব মিলিয়ে, মেটলাইফের গবেষণা কর্মক্ষেত্রের দুটি পরিবর্তন সামনে এনেছে। একদিকে কর্মীরা নিজেরাই এআই ব্যবহার করে কাজের ধরন বদলাচ্ছেন, অন্যদিকে তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ এখন শুধু নতুন প্রযুক্তি চালু করা নয়, কর্মীদের সেই প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা এবং একই সঙ্গে তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তায় সহায়তা করা। কারণ প্রযুক্তি দিয়ে কাজের গতি বাড়ানো সম্ভব, কিন্তু কর্মীর মাথায় যদি সংসারের খরচ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে, তাহলে সেই প্রযুক্তির পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন।

