প্রচলিত সংবাদমাধ্যমগুলো অনেক আগেই সোশ্যাল মিডিয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এখন নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। কারণ, পাঠকরা এখন চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো এআই চ্যাটবটের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। সংবাদ পাওয়ার স্বাধীনতা এবং নির্ভুলতা এআই চ্যাটবটগুলোর প্রধান সুবিধা। তবে এর ফলে সাংবাদিকতার ভূমিকা এবং পক্ষপাত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী অনেক সংবাদমাধ্যম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের উপায় খুঁজছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তথ্য বিশ্লেষণের কাজে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হচ্ছে, সংবাদ তৈরির পদ্ধতির পরিবর্তন নয় বরং পাঠকের সংবাদ গ্রহণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসছে।
এত দিন ধরে এআইয়ের প্রভাব সংবাদমাধ্যমের অভ্যন্তরে ছিল। বিশেষত, এআই সাংবাদিকদের লেখা খসড়া তৈরি, প্রতিবেদনের সম্পাদনা এবং ডেটা সংক্ষেপণে সহায়তা করেছে। কিন্তু এখন পাঠকরা চ্যাটবটের মাধ্যমে সংবাদকে আরও বেশি ইন্টারঅ্যাকটিভভাবে গ্রহণ করছেন। তারা চ্যাটবটের কাছে প্রশ্ন করছেন, সারসংক্ষেপ চাইছেন বা কোনো বিষয় নিয়ে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিচ্ছেন। এতে সংবাদ পাঠে তারা এখন শুধুই শোনার জায়গায় নয়, সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠেছেন।
দ্য নিউইয়র্কারের একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান সংখ্যক পাঠক সংবাদ ফিল্টার, সংক্ষিপ্তকরণ এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য পেতে এআই চ্যাটবটের দিকে ঝুঁকছেন। এমনকি তারা কিছু সময় ঐতিহ্যবাহী সংবাদ মাধ্যমগুলোকে উপেক্ষা করছেন। ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমে সংবাদ পড়া একটি একমুখী প্রক্রিয়া ছিল। কিন্তু এখন চ্যাটবটের মাধ্যমে পাঠকরা দ্বিমুখী যোগাযোগ করতে পারছেন। তারা চাহিদামতো ব্যাখ্যা পেতে পারেন, যতই তাদের প্রশ্ন সাধারণ বা গভীর হোক না কেন।
চ্যাটবটের সাথে কথোপকথন নতুন ধরনের সংবাদ অভিজ্ঞতা তৈরি করছে। সংবাদ এখন আর একক পণ্য নয়। এটি পাঠকের আরও বেশি অনুসন্ধান ও সংযোগের জায়গায় পরিণত হচ্ছে। এখন পাঠকরা খবর পড়তে আসেন না, তারা তথ্য অনুসন্ধান করতে চান এবং সেই অনুযায়ী তা গ্রহণ করেন।
এআইয়ের কারণে সংবাদ পাঠের এই নতুন ধারণা এমন এক নতুন পাঠকের উত্থান ঘটাচ্ছে। যারা ইন্টারঅ্যাকটিভ সংবাদ পছন্দ করেন। তারা খবরের সারসংক্ষেপ, ব্যাখ্যা বা নির্দিষ্ট বিষয় জানতে চায়। এর ফলে, সাংবাদিকতা এবং এআইয়ের সংমিশ্রণে নতুন ধরনের সাংবাদিকতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা পরীক্ষা করতে ইতালীয় সংবাদপত্র ইল ফোগলিও এক মাসব্যাপী পরীক্ষা চালায়। তারা বিশ্বের প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র তৈরি করতে এআই ব্যবহার করে। এই পরীক্ষার ফলাফল বেশ আকর্ষণীয় ছিল। তারা দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছে। এখানে সংবাদ তৈরি করার জন্য এআই কাজ করেছে, তবে মৌলিকতা এবং সূক্ষ্ম ব্যাখ্যায় কিছু সমস্যা দেখা গেছে।
ইল ফোগলিওর অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, সংবাদ তৈরি করতে হলে মানুষের তদারকি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এআই প্রতিবেদন সংক্ষেপ, শৈলীর অনুকরণ এবং দ্রুত খসড়া তৈরিতে সফল হলেও মৌলিক চিন্তা এবং ব্যতিক্রমী প্রতিবেদন তৈরিতে অনেক সময় সমস্যায় পড়ে।
এআই পত্রিকায় আরও উন্নতি করতে চাইছে। ইল ফোগলিও এখন সাপ্তাহিকভাবে এআই ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে। এআই ব্যবহারে অভ্যস্ত পাঠকদের জন্য তারা এই সেবা চালু করতে যাচ্ছে। এআই ও সংবাদমাধ্যমের এই যুগলবন্দী নতুন ধরনের পাঠকের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করছে।
তরুণ প্রজন্ম বিশেষভাবে এআই দিয়ে সংবাদ পড়তে চাইছে। তারা দ্রুত, ফিল্টার করা এবং ঝামেলামুক্ত সংবাদ চায়। তাদের জন্য, পুরো নিবন্ধ পড়ার চেয়ে চ্যাটবট দিয়ে সারসংক্ষেপ বা চ্যাট-স্টাইল ডাইজেস্ট পড়া সহজ। এটি সংবাদমাধ্যমকে নতুন ধরনের সাংবাদিকতা ভাবতে বাধ্য করবে।
এআই চ্যাটবটগুলো ব্যবহারকারীর প্রশ্নের দ্রুত এবং প্রাসঙ্গিক উত্তর দিতে পারে। এর ফলে পাঠকরা একাধিক নিউজ সাইটে না গিয়ে, চ্যাটবটের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংবাদ বা তথ্য পেতে পারছেন। চ্যাটবটগুলো যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গা থেকে সংবাদ প্রাপ্তির সুবিধা দেয়।
তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। একদিকে এআই চ্যাটবটগুলো কখনো কখনো ভুল তথ্য দিতে পারে, বিশেষত যদি তাদের ডেটা ভুল হয়ে থাকে। অন্যদিকে চ্যাটবটের পক্ষ থেকে পক্ষপাত বা অদৃশ্য পক্ষপাত থাকতে পারে। এই সমস্যা সংবাদ উপস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমে সম্পাদকীয় তদারকি ও তথ্য যাচাইয়ের জন্য যেসব মানুষ কাজ করেন, সেই কাজগুলো চ্যাটবটের দ্বারা হয় না। এতে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। চ্যাটবটের উত্সের স্বচ্ছতা অনেক সময় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
এআই চ্যাটবটের উপর নির্ভরশীল হয়ে পাঠকরা ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমের কাছে কম আগ্রহী হতে পারে। এতে বিজ্ঞাপন রাজস্ব এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য কম বিনিয়োগ হতে পারে।
তবে সাংবাদিকদের কি নিজেদের লেখার ধরন পরিবর্তন করা উচিত? কিংবা তাদের এমন সাংবাদিকতা তৈরি করা উচিত, যা চ্যাটবটকে তথ্য সরবরাহ করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন সময়ের সঙ্গে বদলাবে। এআই চ্যাটবট সম্ভবত সংবাদ উৎপাদনের নতুন ধারার দিকে গণমাধ্যমকে পরিচালিত করবে। তবে পক্ষপাত এবং ভুল ব্যাখ্যার ঝুঁকি নিয়েও সচেতনতা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
এভাবেই, সাংবাদিকতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হতে পারে। যা ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের চেহারা পরিবর্তন করবে।

