বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোনে ছবি তোলার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। প্রতিদিন অগণিত মুহূর্ত ধরা পড়ছে ক্যামেরায়, যা সংরক্ষণের জন্য ভরসা করা হচ্ছে ফোনের মেমোরি বা ক্লাউড সেবার ওপর। তবে ভবিষ্যতে এসব ছবি হয়তো সংরক্ষণ করা হবে ডিএনএ-তে—হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন, মানুষের জিনের সেই অদ্ভুত কিন্তু শক্তিশালী উপাদানেই।
শুনতে কল্পবিজ্ঞান মনে হলেও, এই ভবিষ্যৎকে বাস্তবে রূপ দিতে কাজ করছেন সুইজারল্যান্ডের ইপিএফএল (EPFL) বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। তারা ছবি সংরক্ষণের প্রচলিত মাধ্যম, যেমন হার্ড ড্রাইভের বদলে কৃত্রিম ডিএনএ ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষণের নতুন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন।
বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ছবি তোলা হয় বলে ধারণা করা হয়। এত বিপুল সংখ্যক ছবির দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সংরক্ষণ এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে অধিকাংশ ছবি ক্লাউড স্টোরেজে রাখা হয়, যা পরিচালিত হয় বিশাল আকারের ডেটা সেন্টারের মাধ্যমে। এসব সেন্টারে থাকে অসংখ্য হার্ড ড্রাইভ ও ম্যাগনেটিক টেপ, যা জায়গা নেয়, বিদ্যুৎ খরচ করে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিকল হয়ে পড়তে পারে।
সেখানে ডিএনএ স্টোরেজ অনেকটাই বিপরীত বৈশিষ্ট্যের। এটি ক্ষুদ্র, স্থিতিশীল এবং হাজার হাজার বছর টিকে থাকার ক্ষমতা রাখে। ইপিএফএলের মাল্টিমিডিয়া সিগন্যাল প্রসেসিং গ্রুপের প্রধান তুরাজ ইব্রাহিমি জানান, মাত্র এক গ্রাম ডিএনএতে সংরক্ষণ করা সম্ভব ২১৫ মিলিয়ন গিগাবাইট তথ্য—যা প্রায় ১০ লাখ এক্সটার্নাল হার্ড ড্রাইভের সমান।
ডিএনএতে তথ্য লেখার পদ্ধতিও ভিন্ন। চারটি রাসায়নিক উপাদান—এ, টি, সি ও জি—এর অনুক্রমে ডিজিটাল তথ্য রূপান্তর করে সংরক্ষণ করা হয়। পরে দরকার হলে সেই ডিএনএ পাঠ করে তা আবার ডিজিটাল ফর্মে ফিরিয়ে আনা যায়।
তবে এই পদ্ধতি সহজ নয়। ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং তথ্যের নির্ভুলতা বজায় রাখাটাও বেশ জটিল। এই জটিলতাগুলো দূর করতে এগিয়ে এসেছে ইব্রাহিমির গবেষণা দল। ২০১৪ সাল থেকে তিনি জেপিইজি কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন—যারা বিশ্বব্যাপী ছবি ফরম্যাটের মান নির্ধারণ করে।
এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা এখন JPEG DNA নামে নতুন একটি ফরম্যাট তৈরির কাজ করছে, যা বিশেষভাবে ডিএনএতে ছবি সংরক্ষণের জন্য ডিজাইন করা হচ্ছে। ইউরোপ ও জাপানের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এই প্রকল্পে অংশ নিচ্ছে।
ডিএনএ সিকোয়েন্সের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে দলটি এমন এক টুল তৈরি করেছে, যা বিভিন্ন কোডিং পদ্ধতির কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে। একইসঙ্গে তারা এমন একটি ছবি সংকোচন (compression) অ্যালগরিদম তৈরি করেছে, যা JPEG ফাইলকে ডিকোড না করেই সরাসরি ডিএনএতে রূপান্তর করতে পারে—ফলে সময় ও শক্তি দুই-ই সাশ্রয় হয়।
এছাড়া ত্রুটি সংশোধন প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিএনএ থেকে ছবি পুনরুদ্ধারের সময় অখণ্ডতা নিশ্চিত করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির সহায়তায় JPEG DNA আরও দক্ষ হবে বলেই আশা করছেন গবেষকরা।
তাদের মতে, ভবিষ্যতে ক্লাউড নয়, মানুষের স্মৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে পারে এই ‘ডিএনএ স্টোরেজ’। তথ্য সংরক্ষণের ধারায় এটি হতে পারে এক বিপ্লব।

