ওপেনএআই-এর নতুন জিপিটি-৫ (GPT-5) নিয়ে শুরুটা যতটা উৎসাহে ভরা ছিল, মুক্তির পরের প্রতিক্রিয়া ততটাই মিশ্র। গত বৃহস্পতিবার এই বহুল প্রতীক্ষিত সংস্করণটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলেও অনেক ব্যবহারকারী এটিকে আপগ্রেডের চেয়ে বরং “ডাউনগ্রেড” বলেই আখ্যা দিচ্ছেন। তাদের অভিযোগ—নতুন চ্যাটজিপিটি আগের তুলনায় স্বভাব হারিয়েছে, কথাবার্তায় কম প্রাণবন্ত এবং অদ্ভুত কিছু ভুলও করছে।
শুক্রবার (৮ আগস্ট) ওপেনএআই প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, প্লাস ব্যবহারকারীদের জন্য আগের জনপ্রিয় মডেল জিপিটি-৪ও (GPT-4o) চালু থাকবে। তিনি স্বীকার করেন, এক নতুন ফিচার—যেটি প্রশ্নের জটিলতা অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিন্ন মডেলে স্যুইচ করার কথা—প্রকাশের দিনই বিঘ্ন ঘটে। ফলে জিপিটি-৫ অনেকের কাছে “কম বুদ্ধিমান” বলে মনে হয়েছে। অল্টম্যান প্রতিশ্রুতি দেন, এই সমস্যার সমাধান এবং জিপিটি-৫-এর সামগ্রিক পারফরম্যান্স উন্নত করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।জিপিটি-৫ নিয়ে আগাম প্রচারণা ছিল আকাশছোঁয়া। ২০২৩ সালের মার্চে জিপিটি-৪ উন্মোচিত হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞরা স্তম্ভিত হয়েছিলেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, জিপিটি-৫ হবে আরও বিস্ময়কর। ওপেনএআই দাবি করেছিল, নতুন মডেলটি পিএইচডি-স্তরের বুদ্ধিমত্তা এবং অসাধারণ কোডিং দক্ষতা অর্জন করেছে। পরিকল্পনা ছিল, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা মসৃণ করতে সহজ প্রশ্ন সস্তা মডেলে এবং জটিল প্রশ্ন উন্নত মডেলে পাঠানো হবে—যা কোম্পানির খরচও কমাবে।
কিন্তু প্রকাশের পরপরই চ্যাটজিপিটি নিয়ে গড়া রেডিট কমিউনিটিতে অভিযোগের বন্যা বইতে থাকে। অনেকেই লিখেছেন, আগের মডেলের সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠতা ছিল, তা হারিয়ে গেছে। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন—“কয়েকদিন ধরে জিপিটি-৫ ব্যবহার করছি, নির্দেশনা কাস্টমাইজ করার পরও আগের মতো মনে হয় না। এটা বেশি টেকনিক্যাল, বেশি সাধারণীকৃত, আর যেন আবেগ থেকে দূরে।” আরেকজনের মন্তব্য—“যদি আপনার সূক্ষ্মতা আর অনুভূতি পছন্দ না হয়, তবে জিপিটি-৫ ঠিক আছে।”অন্য অনেক পোস্টে ধীরগতির উত্তর, তথ্যগত ভুল এবং অবাক করা ত্রুটির কথা বলা হয়েছে। এর জবাবে অল্টম্যান ঘোষণা দেন—প্লাস ব্যবহারকারীদের জন্য জিপিটি-৫-এর ব্যবহারের সীমা দ্বিগুণ করা হবে, মডেল-সুইচিং সিস্টেম উন্নত করা হবে এবং ব্যবহারকারীরা চাইলে “থিংকিং মোড” চালু করতে পারবেন, যা বেশি গভীর ও ধীর বিশ্লেষণ করবে।
তিনি এক্সে লেখেন—“আমরা সবকিছু একসঙ্গে চালু করায় কিছুটা ঝাঁকুনি আসবেই ভেবেছিলাম, কিন্তু বাস্তবে সেটা একটু বেশি হয়েছে।” ওপেনএআই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি কেন জিপিটি-৫ কখনও কখনও সহজ প্রশ্নেও ভুল করছে।এই বিতর্ক আবারও সামনে এনেছে—ব্যবহারকারীরা কিভাবে এআই চ্যাটবটের সঙ্গে মানসিক বন্ধন গড়ে তোলেন। কেউ কেউ এই অভিযোগকে দেখছেন অস্বাস্থ্যকর নির্ভরতার প্রমাণ হিসেবে। গত মার্চে ওপেনএআই এক গবেষণায় দেখিয়েছিল, মানুষ প্রায়শই তাদের মডেলের সঙ্গে আবেগগত সম্পর্ক গড়ে তোলে। এর কিছুদিন পরই তারা জিপিটি-৪ও-তে পরিবর্তন আনে, কারণ সেটি অতিরিক্ত প্রশংসাসূচক হয়ে উঠেছিল।
এমআইটি-র অধ্যাপক প্যাটি ম্যাস মনে করেন, জিপিটি-৫ তুলনামূলক কম প্রশংসাসূচক, বেশি “ব্যবসায়িক” এবং কম আড্ডাবাজ। তার মতে, এটি আসলে ভালো দিক—কারণ অযাচিত প্রশংসা বিভ্রান্তি ও পক্ষপাত তৈরি করতে পারে। তবে অনেক ব্যবহারকারী এমন মডেলই পছন্দ করেন যা তাদের মতামত ও বিশ্বাস, ভুল হলেও, নিশ্চিত করে দেয়।
স্যাম অল্টম্যানও স্বীকার করেছেন, জিপিটি-৫ তৈরি করার সময় এই ভারসাম্য নিয়ে তাদের ভাবতে হয়েছে। তার ভাষায়—“অনেকেই চ্যাটজিপিটিকে কার্যত থেরাপিস্ট বা লাইফ কোচ হিসেবে ব্যবহার করেন, যদিও হয়তো তারা তা স্বীকার করেন না। এতে অনেকের উপকার হলেও, কখনও কখনও এটি দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণ থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারে।”
নতুন মডেলের সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রমাণ, অন্যদিকে ব্যবহারকারীর সঙ্গে সেই পুরনো সম্পর্ক ও আস্থা ফিরে পাওয়া।

