দেশের অর্থনীতি এখনো চাপের মধ্যেই রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত ও বাড়িভাড়া—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ধারদেনা করে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ কমানোর দাবি তুলেছেন অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। এর আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে পৌঁছায়, যা ছিল ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
২০২৪-২৫ করবর্ষে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৩ শতাংশে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। আগের করবর্ষে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও করমুক্ত আয়সীমা দীর্ঘ সময় অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমানে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাসে নিট আয় ২৯ হাজার ১৬৭ টাকা হলেই একজন নাগরিককে আয়কর দিতে হচ্ছে। কর না দিলে আইন অনুযায়ী জরিমানা ও জেলের বিধানও রয়েছে।
যদিও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে পরবর্তী দুই করবর্ষের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এতে মাসিক নিট আয় ৩১ হাজার ২৫০ টাকার বেশি হলে কর দিতে হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৃদ্ধি বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রাজস্ব বিশ্লেষক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, নিম্ন আয়ের বহু করদাতার কাছ থেকে যে পরিমাণ কর আদায় হয়, অনেক সময় উচ্চ আয়ের একজন করদাতার কাছ থেকেই তার চেয়ে বেশি রাজস্ব আসে। তাই করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা করা হলেও সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না।
তার মতে, করদাতার সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় এনবিআর আয়সীমা বাড়াতে অনীহা দেখায়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, বড় করদাতাদের কাছ থেকে সরকারের পাওনা করের পরিমাণ ইতোমধ্যে এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের ওপর চাপ না বাড়িয়ে বড় কর ফাঁকি বন্ধের দিকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডিও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে গড় মূল্যস্ফীতির কারণে ভোগ্যপণ্যের দাম ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। কিন্তু করমুক্ত আয়সীমা কার্যত স্থির রয়েছে। এতে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ বাড়ছে। সিপিডির মতে, যৌক্তিক করমুক্ত আয়সীমা কমপক্ষে ৪ লাখ টাকা হওয়া উচিত। কারণ বর্তমান কর কাঠামো মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমিয়ে দিতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যাদের মাসিক আয় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার মধ্যে, নতুন প্রস্তাবিত কর কাঠামোর কারণে তাদের বছরে গড়ে প্রায় ১১ হাজার টাকা অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে। অথচ বছরে ৩০ লাখ টাকা আয় করা পরিবারগুলোর কর তুলনামূলক কম হারে বাড়বে। এদিকে বাজার পরিস্থিতিও সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত দুই বছরে চাল, আটা, ময়দা, ডাল, সয়াবিন তেল, চিনি ও মসলাসহ প্রায় সব খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে মাংস, মাছ, ডিম, দুধের মতো প্রোটিনজাতীয় খাদ্যের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে।
চিকিৎসা খাতেও বেড়েছে ব্যয়। বহুল ব্যবহৃত শতাধিক জেনেরিক ওষুধের ৫৩টি ব্র্যান্ডের দাম বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষা উপকরণ, যাতায়াত ব্যয় এবং পোশাকের দামও বেড়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ভ্যাট, কাঁচামালের খরচ ও শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে প্রায় সব খাতে। বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতির অভিযোগ রয়েছে। কর ফাঁকি দিয়ে অনেক বাড়ির মালিক ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ালেও কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দেশে দারিদ্র্যের হার নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে আসছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির জরিপ বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। বিবিএসের হিসাবে এই হার ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। আর বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, যা পরে বেড়ে ২১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার আশপাশে বা নিচে অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেও খাদ্যপণ্য আমদানিতে উৎসে কর বহাল রয়েছে। আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৮৯ অনুযায়ী ধান, চাল, গম, মাছ, মাংস, ডাল, আদা, হলুদ, গুঁড়ো দুধ, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে ০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ বা তার বেশি হারে উৎসে কর কাটা হয়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আমদানির সময় আগাম কর পরিশোধ করতে হয়। পরে সেই অর্থ ফেরত পেতে দীর্ঘ জটিলতায় পড়তে হয়। ফলে ব্যবসায়ীরা সেই বাড়তি খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করে দেন, যার চাপ শেষ পর্যন্ত পড়ে ভোক্তার ওপর।
এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, খাদ্যপণ্যে উৎসে কর প্রত্যাহার করা হলে বাজারে পণ্যের দাম কিছুটা কমতে পারে। শুধু খাদ্য নয়, সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের ব্যবহার্য পণ্য যেমন টুথব্রাশ, সাবান, শ্যাম্পু, বৈদ্যুতিক লাইট, ফ্যান ও বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রীও ভ্যাটের আওতায় রয়েছে। আগামী বাজেটে ভ্যাটের আওতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। এতে উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলের ছোট দোকানও ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে হলে করমুক্ত আয়সীমা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নিত্যব্যবহার্য পণ্যকে ভ্যাটের বাইরে রাখতে হবে এবং খাদ্যপণ্য আমদানিতে উৎসে কর কমানো বা প্রত্যাহার করতে হবে।
সিভি/এম

