চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের ইতিহাসে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় রাজস্ব ঘাটতির ঘটনা।
অর্থনীতির ধীরগতি, উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্য এবং উন্নয়ন ব্যয়ের কম বাস্তবায়ন—সব মিলিয়ে রাজস্ব সংগ্রহে কাঙ্ক্ষিত গতি পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অর্থবছরের শেষ দুই মাসে আদায়ে কিছুটা উন্নতি হলেও শেষ পর্যন্ত অন্তত ১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি থেকেই যেতে পারে।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে রাজস্ব আদায় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়েছে। অথচ আগের বছরগুলোতে মাসভিত্তিক গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৪ শতাংশ ছিল। তার ভাষ্য, অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি কিছুটা ভালো থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে।
এনবিআরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ মাসে মোট রাজস্ব প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৬০ শতাংশে। তবে এই প্রবৃদ্ধি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে যথেষ্ট নয়।
রাজস্ব ঘাটতির পেছনে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতিকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, আগের সরকারের সময় বাস্তব সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পাশাপাশি অর্থনীতির সামগ্রিক মন্থরতার প্রভাবও রাজস্ব আদায়ে পড়েছে।
তার মতে, সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় অংশ আসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় থেকে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের গতি কম থাকায় ভ্যাটসহ বিভিন্ন কর আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তবে বছরের শেষ দিকে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনাও দেখছেন তিনি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো এবং শেষ দুই মাসে রাজস্ব সংগ্রহে কিছুটা গতি আসতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি। তারপরও তার আশঙ্কা, বছর শেষে অন্তত ১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি থেকে যাবে।
এপ্রিল মাসের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আমদানি শুল্ক ও আয়কর আদায়ে যথাক্রমে ১৮ শতাংশ এবং ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ভ্যাট আদায় ৩ শতাংশ কমেছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভ্যাট আয়ের বড় অংশ আসে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে। সরকারি খাত থেকে উৎসে কর কম আসায় ভ্যাট আদায়েও বড় প্রভাব পড়েছে।
এনবিআরের ভ্যাট বাস্তবায়ন শাখার সদস্য সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, এডিপি বাস্তবায়ন কমে যাওয়ায় সরাসরি ভ্যাট আদায়েও চাপ তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও প্রত্যাশিত পরিমাণ ভ্যাট পাওয়া যাচ্ছে না।
সরকার আগামী অর্থবছরে এনবিআর ও নন-এনবিআর মিলিয়ে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করতে যাচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের অনেকে এই লক্ষ্যকে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করছেন না।
সিপিডির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ের ভিত্তিতে আগামী বছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে।
তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০০৭-০৮ অর্থবছরে, যা ছিল ২৭ শতাংশ। সেই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় আগামী অর্থবছরে ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন অত্যন্ত কঠিন হবে। ফলে সামনের বছরেও বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।

