বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন করে স্বস্তি ফিরেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়ার পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় আবারও ৩৫ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকের উন্নতি দেশের আমদানি সক্ষমতা, বৈদেশিক লেনদেন এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৪ জুন পর্যন্ত দেশের মোট বা গ্রোস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। মাত্র কয়েক দিন আগেও রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। ফলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে রিজার্ভ।
তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রিজার্ভ হিসাবের ক্ষেত্রে মোট সঞ্চয়ের পাশাপাশি ব্যবহারযোগ্য অর্থের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের রিজার্ভ রয়েছে ৩১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার। এই পদ্ধতিতে এমন কিছু অর্থ বাদ দেওয়া হয়, যা জরুরি প্রয়োজনে সরাসরি ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রিজার্ভের পরিমাণ শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি দেশের আর্থিক সক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, আমদানি ব্যয় নির্বাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পর্যাপ্ত রিজার্ভ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ব্যবহারযোগ্য বা প্রকৃত রিজার্ভ প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। এই অর্থ দিয়েই মূলত প্রয়োজনীয় আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনা করা সম্ভব হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের মাসিক আমদানি ব্যয় গড়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার ধরা হলে, বিদ্যমান ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে পাঁচ মাসেরও বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আন্তর্জাতিকভাবে সাধারণত তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ রিজার্ভকে নিরাপদ সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আয়ের উন্নতি এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের আর্থিক সহায়তা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে বাজেট সহায়তার অর্থ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারকে শক্তিশালী করেছে।
অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, শুধু রিজার্ভ বৃদ্ধি নয়, এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ, প্রবাসী আয় বাড়ানো, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে এডিবির এক বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে অর্থনীতিতে স্বস্তির বার্তা তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে রিজার্ভকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

