দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা। ভোট গ্রহণ চলবে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। প্রার্থী দুজন—বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
সংসদে আসনসংখ্যার হিসাবে অবশ্য নির্বাচনের ফল অনেকটাই অনুমেয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপির সদস্য ২৪৭ জন। বিপরীতে ১১-দলীয় ঐক্যের সদস্য ৯০ জন। ফলে মির্জা ফখরুলের জয় কার্যত নিশ্চিত বলেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ধারণা করা হচ্ছে। তবু দ্বিতীয় একজন প্রার্থী থাকায় এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হচ্ছে।
এ নির্বাচন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর ওই বছরই রাষ্ট্রপতি পদে শেষবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছিল। এরপর একে একে সাতজন রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ফলে দীর্ঘ সময় পর এবার আবার সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।
আজ কোথায় ও কখন ভোট
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সংসদকক্ষেই ভোট গ্রহণ হবে। বর্তমানে সংসদের নিয়মিত অধিবেশন না থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে সংসদ সদস্যদের বিশেষ বৈঠক ডাকা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন নির্বাচনী কর্তা হিসেবে ভোট গ্রহণ পরিচালনা করবেন।
ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের। সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনসহ জাতীয় সংসদের মোট আসন ৩৫০টি হলেও চট্টগ্রাম-৪ আসনের নির্বাচনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে একটি আসনের ফল এখনো ঘোষণা হয়নি। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটারসংখ্যা ৩৪৯।
সংসদে বিএনপির সদস্য ২৪৭ জন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের সদস্য ৯০ জন। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ৭৭ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির ৮ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৩ জন এবং খেলাফত মজলিসের ১ জন সদস্য রয়েছেন। জাগপার একজন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যও এই জোটের সঙ্গে রয়েছেন।
এর বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন এবং স্বতন্ত্র আটজন সংসদ সদস্য রয়েছেন। বিএনপির মিত্র বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, গণ অধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের একজন করে সংসদ সদস্য আছেন।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগও কার্যত সীমিত। কোনো সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য প্রার্থীকে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। ফলে নির্বাচনের ফলের ক্ষেত্রে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাই সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কীভাবে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট সাধারণ নির্বাচনের মতো নয়। দেশের জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন না; সংসদ সদস্যরাই ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন।
তবে এই ভোট প্রকাশ্য পদ্ধতিতে হবে। অর্থাৎ সংসদ সদস্যরা গোপনে শুধু প্রতীক বা চিহ্ন দিয়ে ভোট দেবেন না। ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে নিজের পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে।
প্রথমে একজন সংসদ সদস্যকে ব্যালট পেপারের মুড়ি অংশে নিজের পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করে ব্যালট নিতে হবে। এরপর মূল ব্যালট পেপারে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীর নাম থাকবে। পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত জায়গায় আবার পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে। পরে সেই ব্যালট নির্ধারিত বাক্সে জমা দিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই পদ্ধতিতে ভোটারের পরিচয় গোপন থাকে না। ফলে কোন সংসদ সদস্য কীভাবে ভোট দিয়েছেন, তা দলীয় সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালও সংসদ সদস্য হিসেবে ভোট দিতে পারবেন। তাঁদের জন্য সংসদকক্ষে আলাদা আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে।
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেও সংসদ সদস্য। তাই তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার রাখেন। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দিন তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হয়ে যাবে।
অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ সংসদ সদস্য নন। তাই তিনি নিজে এই নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না।
ভোটের শুরু ও ফল ঘোষণা যেভাবে
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, ভোট গ্রহণের শুরুতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রী ভোট দেবেন। তাঁদের ভোট দেওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
এরপর সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ থাকবে। ভোট গ্রহণ শেষ হলে ব্যালট গণনার সময় আবার সম্প্রচার শুরু হবে। গণনা শেষে জাতীয় সংসদ কক্ষেই নির্বাচনের ফল ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
এরপর নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে। নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটায় বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন চিফ হুইপ।
কেন ৩৫ বছর পর আবার ভোট
১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছিল। ওই বছর রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
সেই নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। এরপর আর বিরোধী দল থেকে রাষ্ট্রপতি পদে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী দেখা যায়নি। ফলে পরবর্তী সাতজন রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন এবং সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি।
এবার জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য অলি আহমদকে প্রার্থী করায় পরিস্থিতি বদলে গেছে। সংখ্যার হিসাবে জয় নিশ্চিতের কাছাকাছি হলেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকায় নির্বাচন কমিশনকে নিয়ম অনুযায়ী ভোট গ্রহণ করতে হচ্ছে।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা ভোট দেবেন। তাঁর মতে, ১৯৯১ সালের পর এবার রাষ্ট্রপতি পদে আবার ভোট অনুষ্ঠিত হওয়া দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা।
রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হওয়ার পর নির্বাচন
এই নির্বাচনের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রয়েছে। গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদ পদত্যাগের কারণে শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়।
সেই সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যেই এবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন গত ৬ আগস্ট ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। এরপর মনোনয়ন, যাচাই-বাছাই ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আজ ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বুধবার জানিয়েছেন, নির্বাচন আয়োজনের সব প্রস্তুতি শেষ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচন শুধু দেশের রাজনৈতিক মহলের নয়, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদেরও নজরে রয়েছে। কারণ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, একজন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সংখ্যার ব্যবধানই কি সব?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির ২৪৭ জন সংসদ সদস্যের বিপরীতে ১১-দলীয় ঐক্যের সদস্য ৯০ জন। তাই কাগজে-কলমে ফলাফলের সমীকরণ বেশ পরিষ্কার। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকার কারণে এবার নির্বাচনটি কেবল ফল ঘোষণার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকছে না।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে দুই প্রার্থীর উপস্থিতিতে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রকাশ্য ভোটের এই পদ্ধতি দলীয় অবস্থান, সংসদীয় রাজনীতি এবং রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
আজকের ভোট শেষ হওয়ার পরই জানা যাবে আনুষ্ঠানিক ফল। তবে নির্বাচনের ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা যতটা কম, ৩৫ বছর পর আবার রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার রাজনৈতিক তাৎপর্য ততটাই বেশি।

