বিশেষ বিশ্লেষণ
দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, কারখানা বাড়ছে, রপ্তানি বাড়ছে; অথচ যাদের হাতে সবচেয়ে বেশি ডিগ্রি, তাদের হাতেই এখন সবচেয়ে বেশি বেকারত্ব। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ সম্প্রতি বাংলাদেশ নিয়ে যে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে উঠে এসেছে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য: উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার ২৫ শতাংশ, যা কম শিক্ষিতদের তুলনায় তিনগুণেরও বেশি। প্রশ্নটা তাই আর শুধু “কতজন বেকার” তা নিয়ে থাকছে না, প্রশ্নটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আসলে কাকে তৈরি করছে, আর অর্থনীতি আসলে কাকে চাইছে।
২০২৫ সালের কনসালটেশন শেষে ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে আইএমএফের নির্বাহী বোর্ডে উপস্থাপিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিক বেকারত্বের হার তুলনামূলক কম, মাত্র ৩.৬৯ শতাংশ। কিন্তু তরুণদের মধ্যে এই হার প্রায় দ্বিগুণ, ৮.৪৯ শতাংশ। শহরাঞ্চলে তরুণ বেকারত্ব ১৩.২৭ শতাংশ, গ্রামে তা ৬.৬৩ শতাংশ। আর সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রটা নারীদের নিয়ে, উচ্চশিক্ষিত নারীদের বেকারত্বের হার ১৬.৬৬ শতাংশ, যা পুরুষদের দ্বিগুণেরও বেশি। আইএমএফ নিজেই বলেছে, উচ্চশিক্ষিতদের এই উচ্চ বেকারত্ব প্রায় এক দশক ধরে “ক্রমাগত” রয়ে গেছে, এবং তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য শ্রমবাজার “উদ্বেগজনকভাবে দুর্বল” হয়ে পড়ছে।
শিল্প বাড়ছে, চাকরি কমছে; এটা কেমন ধাঁধা
এখানেই লুকিয়ে আছে আসল গল্পটা। গত এক দশকে অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অংশ প্রায় ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই খাতে কর্মসংস্থান কমেছে; উৎপাদন খাতে ২.২ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং সেবা খাতে ২.৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। অর্থাৎ অর্থনীতি শিল্পায়িত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু শ্রমশক্তি উল্টো দিকে হাঁটছে। আইএমএফ এই প্রবণতাকে বলেছে “জবলেস গ্রোথ” বা কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি। একই সময়ে কৃষির জিডিপি-অংশ কমেছে প্রায় ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট, অথচ এই খাতেই কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪.৮ শতাংশীয় পয়েন্ট। এর মানে দাঁড়ায়, যাদের ডিগ্রি আছে, তারা শিল্প বা সেবা খাতে জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে আবার কৃষিতে ফিরছেন, যে খাত থেকে বেরিয়ে আসাই ছিল উচ্চশিক্ষার মূল প্রতিশ্রুতি। বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিত তরুণরা মূলত আনুষ্ঠানিক খাতে চাকরি খোঁজেন, কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে, ফলে শিক্ষা আর শিল্পের চাহিদার মধ্যে সংযোগ ভেঙে পড়েছে।
সমস্যাটা শুধু চাকরির সংখ্যায় নয়, চাকরির ধরনেও। তৈরি পোশাক খাতে দক্ষ শ্রমিকের তীব্র সংকট থাকলেও, লাখো শিক্ষিত তরুণ বেকার বসে আছেন, কারণ তাদের ডিগ্রি শিল্পের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে মেলে না। সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের ভাষ্যে, আনুষ্ঠানিক খাতে প্রবৃদ্ধি এতটাই কম কর্মসংস্থান-সৃষ্টিকারী যে ক্রমবর্ধমান শ্রমশক্তি সীমিত চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা করছে, আর এই অসন্তোষই ছিল গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম চালিকাশক্তি। বিদেশে কর্মসংস্থানও যথেষ্ট সমাধান দিতে পারবে না বলে তিনি মনে করেন, তাই দৃষ্টি ফেরাতে হবে দেশীয় বাজার আর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে।
সমস্যাটা কি আসলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়, নাকি আরও আগে থেকে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বিশ্বব্যাংকের একটি হিসাবের দিকে তাকাতে হবে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে অনেক আগের গল্প বলে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের লার্নিং পভার্টি ব্রিফ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাইমারি স্তরের শেষে থাকা শিশুদের মধ্যে ৫১ শতাংশ একটি বয়স-উপযোগী সাধারণ লেখা পড়ে বুঝতে সক্ষম নয়। অর্থাৎ, প্রতি দুইজনের একজন শিশু দশ বছর বয়সেই মৌলিক পাঠ দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। এই সংখ্যাটা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে কিছুটা ভালো হলেও, এর অর্থ এই নয় যে পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক কারণ এই একই প্রজন্মের শিশুরাই দশ-বারো বছর পর শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে ডিগ্রি হাতে নিয়ে। যে ভিত্তিতে পড়াশোনার প্রথম ইট বসানো হয়নি, তার ওপর যত বড় সার্টিফিকেটই চড়ানো হোক না কেন, বিশ্লেষণ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা সেখানে আশা করা কঠিন। এই কারণেই শুধু বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কারের কথা বললে সমস্যাটার অর্ধেক অংশই এড়িয়ে যাওয়া হয়; আসল কাজ শুরু করতে হবে প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষ থেকেই।
আর এই জায়গাতেই টাকার হিসাবটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ বা জাতীয় বাজেটের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা উচিত। বাংলাদেশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ রেখেছিল জিডিপির মাত্র ১.৩৯ শতাংশ, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাড়িয়ে ২ শতাংশে নেওয়া হয়েছে, সরকার নিজেই স্বীকার করেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় চেয়েছিল ৩.৫ শতাংশ। এই ঘাটতি শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ক্লাসরুমের মানে, শিক্ষক প্রশিক্ষণে, আর গবেষণাগার বা লাইব্রেরির মতো সুযোগ-সুবিধায়। প্রশ্ন হলো, যে বিনিয়োগটুকু আসছে, সেটাও কি সঠিক জায়গায় যাচ্ছে? নাকি সার্টিফিকেট বিতরণের কাঠামো টিকিয়ে রাখতেই খরচ হয়ে যাচ্ছে, দক্ষতা তৈরির জায়গায় পৌঁছানোর আগেই?
সমাধানটা কোথায়, আর কেন এটা শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একার কাজ নয়
আইএমএফের প্রতিবেদনেই আসলে সমাধানের একটা কাঠামো দেওয়া আছে, যা নিছক মন্তব্য নয়; কাঠামোগত সংস্কারের একটি তালিকা। প্রথমত, শিল্প কাঠামো উন্নত করে উচ্চ-উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ চালিত করা দরকার, যাতে বৈচিত্র্যময় ও মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ গড়ে তোলা জরুরি; যৌথভাবে ডিজাইন করা অ্যাপ্রেন্টিসশিপ কর্মসূচি ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-প্রকৌশল-গণিত (স্টেম) শিক্ষা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তৃতীয়ত, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই বাড়ানো, যা এখন তুলনামূলক অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে অনেক কম. এই বিনিয়োগ প্রযুক্তি হস্তান্তর ও শিল্প বৈচিত্র্যকরণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এই তিনটি সুপারিশ একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সমস্যাটা কোনো একটি মন্ত্রণালয়ের একার সমাধান করার মতো নয়; এখানে অর্থ, শিল্প ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে বসে কাজ করতে হবে, যা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী কাঠামোতে এখনও বিরল দৃশ্য।
আসল কথা হলো, একটি দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ যখন তরুণ, তখন সেই “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” বা জনমিতিক লভ্যাংশ শুধু তখনই কাজে আসে, যখন সেই তরুণদের দক্ষতা আর অর্থনীতির চাহিদা একই দিকে হাঁটে। বাংলাদেশে এখন যা ঘটছে, তা এই দুই স্রোতের বিপরীতমুখী চলাফেরা। একদিকে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে তাদের জন্য উপযুক্ত চাকরির সংখ্যা বাড়ছে না। এই ফাঁক যত দিন থাকবে, তত দিন একটি শিক্ষিত প্রজন্ম হয় কৃষিতে ফিরে যাবে, নয়তো বিদেশে পাড়ি জমাবে, নয়তো হতাশা নিয়ে ঘরে বসে থাকবে। আর এই তিনটি পথের কোনোটিই দেশের অর্থনীতির জন্য লাভজনক নয়। তাই প্রশ্নটা এখন আর শুধু “কত শতাংশ বেকার” তা নয়; প্রশ্নটা হলো, আগামী বাজেট, আগামী শিক্ষানীতি এবং আগামী শিল্পনীতি কি সত্যিই একে অপরের সঙ্গে কথা বলবে, নাকি প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিজের মতো করে আলাদা পথে হাঁটতেই থাকবে।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

