বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে চীন ও ভারতের আধিপত্য রয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আমদানির জন্য বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে এই দুই দেশের ওপর।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক সমঝোতা এবং বিভিন্ন পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতির কারণে নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—ভবিষ্যতে কি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় আমদানি উৎসে পরিণত হতে পারে?
বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ১৬ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার।
একই সময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি হয়েছে ৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৯ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে ৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
বাংলাদেশ এতদিন মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে রপ্তানি বাজার হিসেবে ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজারগুলোর একটি।
তবে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় জ্বালানি, কৃষিপণ্য, বিমান, সামরিক সরঞ্জামসহ বিভিন্ন খাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় অঙ্কের পণ্য কেনার বিষয় সামনে এসেছে।
এই চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হলো দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যের পার্থক্য কমানো। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চীন ও ভারতকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের প্রধান আমদানি উৎস হতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে বাংলাদেশ কী ধরনের পণ্য আমদানি করে তার ওপর।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাকের মতে, বাংলাদেশের আমদানি কাঠামোর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চীন ও ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য তুলা, সুতা, কাপড়, রং, রাসায়নিক এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতির বড় অংশ আসে চীন ও ভারত থেকে। এসব পণ্যের জন্য দেশ দুটির দীর্ঘদিনের শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা রয়েছে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হলেও চীন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার একটি তৈরি করেছে।
উদাহরণ হিসেবে ভুট্টার কথা বলা যায়। বাংলাদেশ ২০২৫-২৬ বিপণন বছরে সাত বছর পর আবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভুট্টা আমদানি শুরু করেছে। তবে মোট ভুট্টা আমদানির মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
এ ক্ষেত্রে ব্রাজিল ছিল সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী, যাদের অংশ ছিল ৬৮ শতাংশ। ভারতের অংশ ছিল ২৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ তুলা আমদানি করে ভারত, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, অস্ট্রেলিয়া ও আর্জেন্টিনা থেকে। সয়াবিনের জন্য বড় অংশে নির্ভর করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ওপর। গম আসে রাশিয়া, ইউক্রেন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিশেষ খাতে বড় সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি, উচ্চপ্রযুক্তি পণ্য, বিমান, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে।
পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।
গম আমদানির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় চুক্তি হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে চুক্তির আওতায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৭ লাখ টন যুক্তরাষ্ট্রের গম কেনার বিষয় রয়েছে।
বিমান খাতেও যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব বাড়ছে। রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িংয়ের কাছ থেকে নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে।
এ ছাড়া বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসও বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা জানিয়েছে।
তবে শুধু চুক্তি করলেই যুক্তরাষ্ট্র চীন ও ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, সাধারণ পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের জায়গা নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন। কারণ বাংলাদেশের শিল্প কাঠামো এই দুই দেশের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
দূরত্বও একটি বড় বিষয়। চীন ও ভারত থেকে তুলনামূলক দ্রুত পণ্য আনা যায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘ সমুদ্রপথের কারণে পরিবহন ব্যয়, মজুত খরচ এবং অর্থায়নের খরচ বেড়ে যেতে পারে।
তবে উচ্চমূল্যের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সুবিধা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, উচ্চপ্রযুক্তি পণ্য, এলএনজি, সেমিকন্ডাক্টর এবং বিমান খাতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বড় সরবরাহকারী হতে পারে।
তবে তুলা, সয়াবিন ও গমের মতো পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চীন ও ভারতসহ অন্যান্য বড় সরবরাহকারীদের জায়গা দখল করা বাস্তবসম্মত নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমদানি অংশীদার হয়ে উঠতে পারে, তবে চীন ও ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থান পরিবর্তন করা সহজ হবে না। বাংলাদেশের শিল্প কাঠামো, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আমদানি প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করেই ভবিষ্যতের বাণিজ্য ভারসাম্য নির্ধারিত হবে।

