মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ঘাটতি সামাল এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নতুন করে ব্যয়সংযম নীতি ঘোষণা করেছে সরকার। নতুন নির্দেশনায় সরকারি খাতে নতুন যানবাহন কেনা, ভবন নির্মাণ, জমি অধিগ্রহণ এবং অধিকাংশ বিদেশ সফরের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের জারি করা এক পরিপত্রে জানানো হয়েছে, মন্ত্রণালয়, বিভাগ, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ও সরকারি করপোরেশন—সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ে সাশ্রয়ী নীতি অনুসরণ করতে হবে।
সরকার এমন সময়ে নতুন ব্যয়সংযম নীতি কার্যকর করল, যখন প্রত্যাশার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ চার হাজার কোটি টাকাকে ছাড়িয়ে গেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর আগে জানিয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তাদের মোট রাজস্ব আদায় প্রায় চার লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা কম। জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায় হয়েছে তিন লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। দেশের মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশই আসে এনবিআরের মাধ্যমে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নের জন্য এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা এবং কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের অভাবে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এদিকে গত অর্থবছরে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এর পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতাও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
নতুন ব্যয়সংযমে যেসব খাতে কড়াকড়ি:
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালন বাজেটের সব ধরনের ব্লক বরাদ্দ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মোটরযান, নৌযান ও উড়োজাহাজ কেনাও বন্ধ থাকবে। তবে ১০ বছরের বেশি পুরোনো সরকারি যানবাহন প্রতিস্থাপন এবং নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় যানবাহন কেনার ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন নিতে হবে। এছাড়া অ্যাম্বুলেন্স ও নিরাপত্তা বাহিনীর যান ছাড়া নতুন বা প্রতিস্থাপিত সব সরকারি গাড়ি ও জিপ সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক হতে হবে।
নতুন ভবন নির্মাণেও বিধিনিষেধ:
সরকারি আবাসিক, অনাবাসিক ও অন্যান্য নতুন ভবন নির্মাণে ব্যয় আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে যেসব প্রকল্পের নির্মাণকাজ অন্তত ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে, সেগুলো অর্থ বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে চালিয়ে নেওয়া যাবে। পরিচালন বাজেট থেকে জমি অধিগ্রহণের ব্যয়ও বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার জন্য দেওয়া সুদমুক্ত ঋণ সুবিধাও বাতিল করা হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্পেও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ:
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় নতুন করে যানবাহন কেনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে যেসব প্রকল্পে এই পরিপত্র জারির আগেই যানবাহন কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। উন্নয়ন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও সব আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর অর্থ বিভাগের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের আওতায় ‘বিশেষ প্রয়োজনের উন্নয়ন সহায়তা’ খাতের সংরক্ষিত বরাদ্দ থেকে কোনো ব্যয় করতে হলেও অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
সরকারি অর্থায়নে বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। তবে বিদেশি সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় বা উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার বৃত্তি বা ফেলোশিপের মাধ্যমে মাস্টার্স ও পিএইচডি করতে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ বহাল থাকবে। এ ছাড়া বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা উন্নয়ন সহযোগীদের সম্পূর্ণ অর্থায়নে পরিচালিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও অংশ নেওয়া যাবে।
অন্যদিকে, বিদেশে আয়োজিত বাধ্যতামূলক মৌলিক প্রশিক্ষণের বিদেশি অংশ চালিয়ে নেওয়া যাবে। প্রযুক্তিগতভাবে জটিল পণ্য বা বাধ্যতামূলক পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) এবং ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপট্যান্স টেস্ট (এফএটি) সম্পন্ন করতে বিদেশ সফরের অনুমতি থাকবে। তবে এসব সফরে শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা কারিগরি সনদপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই অংশ নিতে পারবেন।

