দেশের চলমান গ্যাস সংকট এখন আর শুধু বিদ্যুৎ বা জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে। গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের অসংখ্য কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে, আবার কোথাও গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন লাইন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। একই সময়ে বিদ্যুতের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সোমবার দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় তিন হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি উৎপাদন ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং করতে হয়েছে। শিল্পকারখানাগুলো সাধারণত নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসনির্ভর ব্যবস্থা ব্যবহার করে। কিন্তু গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সেই সুবিধাও সীমিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে জাতীয় গ্রিড থেকেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে গেছে। অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় উৎপাদন লাইন পূর্ণমাত্রায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উদ্যোক্তাদের কেউ উৎপাদনের সময় কমিয়ে দিচ্ছেন, কেউ আবার সীমিত পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, কাঁচামাল, শ্রমিক এবং উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানির অভাবে তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছেন না। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, সময়মতো পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপের পরিবর্তে খুবই কম চাপ পাওয়া যাচ্ছে, যা ভারী যন্ত্রপাতি সচল রাখার জন্য যথেষ্ট নয়।
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও এই সংকটের বড় ভুক্তভোগী। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক কারখানা স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম উৎপাদন করছে। কোথাও উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, আবার কিছু কারখানায় উৎপাদন আরও বেশি কমেছে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার চেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে না পারা। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যেতে পারে।
তাদের মতে, অতিরিক্ত ব্যয় কোনোভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও একবার ক্রেতার আস্থা হারালে তা পুনরুদ্ধার করা অনেক কঠিন।
শুধু পোশাক শিল্প নয়, রং, বস্ত্র প্রক্রিয়াজাতকরণ, সিরামিক, রাসায়নিক, সিমেন্টসহ বিভিন্ন খাতেও উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
রং ও ফিনিশিং কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। ফলে আধা-প্রস্তুত পণ্য জমে যাচ্ছে এবং রপ্তানি সময়সূচি বিঘ্নিত হচ্ছে।
সিরামিক শিল্পের উদ্যোক্তারাও জানিয়েছেন, এই শিল্পে চুল্লি একটানা সচল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি যন্ত্রপাতি ও উৎপাদিত পণ্যেরও ক্ষতি হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজিচালিত যানবাহনেও। দেশের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসায় দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।
অনেক চালক অভিযোগ করছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে প্রতিদিনের আয় কমে যাচ্ছে এবং যানবাহনের মালিকদের নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
এর প্রভাব শহরের পরিবহন ব্যবস্থাতেও পড়ছে, কারণ সিএনজিচালিত যানবাহনের সংখ্যা কমে গেলে যাত্রীদের ভোগান্তিও বাড়ে।
গ্যাসের সংকট শুধু শিল্পেই সীমাবদ্ধ নেই। অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতেও রান্নার গ্যাসের চাপ কমে গেছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে তরল গ্যাস বা বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করছে।
কিন্তু একই সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বাড়ায় সেই বিকল্পও সবসময় কার্যকর থাকছে না। এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্ভোগ—দুটিই বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্যাসের ঘাটতি এখন একটি সাময়িক সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। শিল্পকারখানাগুলো যদি দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক সক্ষমতায় ফিরতে না পারে, তাহলে নতুন বিনিয়োগ কমবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে রপ্তানি বৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস অবকাঠামোর উন্নয়নই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের কার্যকর পথ। অন্যথায় চলমান জ্বালানি সংকট দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে আরও মন্থর করে দিতে পারে।

