বিশেষ বিশ্লেষণ
একটি কোম্পানি হঠাৎ ঋণ বাড়াচ্ছে খবরটি শুনে কেউ ভাবতে পারেন, প্রতিষ্ঠানটি বড় হচ্ছে; আবার কেউ ভাবতে পারেন, সামনে বিপদ আসছে। আসলে দুটিই সত্য হতে পারে। ঋণ নিজে ভালো বা খারাপ নয়; প্রশ্ন হলো, সেই ঋণ দিয়ে কোম্পানি কত আয় তৈরি করছে এবং সেই ঋণের সুদ সামলানোর ক্ষমতা কতটা। এই জায়গাটিই বুঝতে সাহায্য করে ডেট-টু-ইকুইটি, ইন্টারেস্ট কভারেজ ও লিভারেজের মতো আর্থিক সূচক।
বাংলাদেশের ব্যবসায়িক বাস্তবতায় বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক জুলাইয়ের শেষে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশ করেছে, মূল উদ্দেশ্যগুলোর একটি ছিল বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু একই সময়ে জুনে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে, যা ১৯৯৩ সালের পর সর্বনিম্ন বলে প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকা আর কোম্পানির সেই ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করার আগ্রহ দুটি বিষয় এক নয়।
ঋণ কখন কোম্পানির জন্য ‘ভালো’ হয়ে যায়?
ধরুন, একটি কোম্পানির নিজের ১০০ কোটি টাকা আছে। এই টাকা দিয়ে ব্যবসা করে বছরে ১৫ কোটি টাকা আয় করছে। এখন কোম্পানি আরও ১০০ কোটি টাকা ঋণ নিল এবং সেই টাকা এমন একটি প্রকল্পে বিনিয়োগ করল, যেখান থেকে অতিরিক্ত ১৫ কোটি টাকা আয় হলো। ঋণের সুদ যদি ৮ কোটি টাকা হয়, তাহলে বাড়তি বিনিয়োগ থেকে সুদ বাদ দিয়েও ৭ কোটি টাকা থাকে। অর্থাৎ কোম্পানির মালিকদের নিজস্ব ১০০ কোটি টাকার ওপর মোট আয় দাঁড়াল ২২ কোটি টাকা। ঋণ না নিলে যেখানে রিটার্ন ছিল ১৫ শতাংশ, ঋণ নিয়ে সেটি হলো ২২ শতাংশ। এটাই ফাইন্যান্সিয়াল লিভারেজের ভালো দিক অন্যের টাকা ব্যবহার করে নিজের মূলধনের ওপর রিটার্ন বাড়ানো।
কিন্তু গল্পের দ্বিতীয় অংশটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই কোম্পানি যদি ১০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এমন প্রকল্পে যায়, যেখান থেকে প্রত্যাশিত আয় আসে না, তখন সুদ কিন্তু থেমে থাকবে না। ব্যবসা ভালো করুক বা খারাপ করুক, নির্দিষ্ট ঋণের সুদ ও মূলধন পরিশোধের দায় থেকেই যায়। তাই ডেট-টু-ইকুইটি রেশিও দেখে প্রথমে বোঝা যায় কোম্পানি নিজের মূলধনের তুলনায় কতটা ঋণ ব্যবহার করছে। ধরুন, কোনো প্রতিষ্ঠানের ঋণ ২০০ কোটি টাকা এবং শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটি ১০০ কোটি টাকা; তাহলে ডেট-টু-ইকুইটি ২। অর্থাৎ মালিকদের প্রতি ১ টাকা মূলধনের বিপরীতে কোম্পানি ২ টাকা ঋণ ব্যবহার করছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট অনুপাতকে একা ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ বলা যায় না শিল্পভেদে স্বাভাবিক ঋণের মাত্রা আলাদা।
আসল পরীক্ষা হয় সুদের বিল হাতে এলে
এখানে আসে ইন্টারেস্ট কভারেজ রেশিও। সহজভাবে বললে, কোম্পানি ব্যবসা থেকে যে আয় করছে, তা দিয়ে সুদের খরচ কতবার মেটাতে পারে এই অনুপাত সেটিই বোঝায়। সাধারণ হিসাব হলো EBIT বা সুদ ও কর দেওয়ার আগের আয়কে মোট সুদ ব্যয় দিয়ে ভাগ করা। ধরুন, একটি কোম্পানির EBIT ৫০ কোটি টাকা এবং সুদ ব্যয় ১০ কোটি টাকা। তাহলে ইন্টারেস্ট কভারেজ ৫ গুণ। অর্থাৎ ব্যবসার আয় দিয়ে সুদের খরচ পাঁচবার মেটানোর মতো সক্ষমতা আছে। অনুপাত যত কমে, কোম্পানির হাতে ভুল করার জায়গাও তত কমে যায়। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসওয়াথ দামোদরনও এই অনুপাতকে ঋণের সুদ পরিশোধে কোম্পানির ‘মার্জিন অব এরর’ বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এখন ধরুন, কোম্পানির ঋণ ১০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০০ কোটি টাকা হলো। কিন্তু একই সময়ে তার EBIT ৫০ কোটি থেকে ৮০ কোটি টাকা হয়েছে। শুধু ঋণ বেড়েছে দেখে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। বরং দেখতে হবে অতিরিক্ত ঋণ ব্যবসার আয়কে কতটা বাড়িয়েছে। বিপরীতে ঋণ ৫০ শতাংশ বাড়লেও যদি EBIT একই থাকে বা কমে যায়, তখন সতর্ক হওয়ার কারণ তৈরি হয়। বিশেষ করে সুদের হার বাড়লে নতুন ঋণ এবং পরিবর্তনশীল সুদের ঋণের খরচ দ্রুত বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সাম্প্রতিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বড় কোম্পানিগুলোর সামগ্রিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তুলনামূলক শক্তিশালী থাকলেও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও ফ্লোটিং-রেট ঋণের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলো সুদের হারের পরিবর্তনে বেশি সংবেদনশীল।
ইতিহাসে ঋণই কখনো শক্তি, কখনো ফাঁদ
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের আগে লেহম্যান ব্রাদার্সের উদাহরণটি এখানে খুব শিক্ষণীয়। ২০০৭ সালের শেষ দিকে প্রতিষ্ঠানটির রিপোর্ট করা লিভারেজ রেশিও ছিল প্রায় ৩০.৭ গুণ এবং নেট লিভারেজ ছিল ১৬.১ গুণ। অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে ছোট ইকুইটির ওপর বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও ঋণভিত্তিক এক্সপোজার তৈরি হয়েছিল। বাজার অনুকূলে থাকলে এমন লিভারেজ রিটার্ন বাড়াতে পারে; কিন্তু সম্পদের মূল্য পড়ে গেলে ক্ষতিও একইভাবে দ্রুত বাড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে লেহম্যান ব্রাদার্সের পতন বৈশ্বিক আর্থিক সংকটকে আরও গভীর করে। অবশ্য লেহম্যান ছিল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, তাই এর লিভারেজকে সাধারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না; তবে লিভারেজ কীভাবে লাভকে যেমন বাড়ায়, ক্ষতিকেও তেমন তীব্র করতে পারে তার ঐতিহাসিক উদাহরণ হিসেবে ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে সাধারণ শিল্প কোম্পানির ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা দেখা যায়। জেনারেল মোটরসের ২০০৮ সালের হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানিটির মোট দায় ছিল ১৭৬.৪ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটি ছিল ঋণাত্মক ৮৬.২ বিলিয়ন ডলার। পরের বছর কোম্পানিকে পুনর্গঠন ও বিপুল সরকারি সহায়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। মার্কিন সরকারি নথিতে তখন স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য জিএমের ঋণ ও লিভারেজ কমানো ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও তাই শুধু ‘ঋণ বেড়েছে’ এই একটি তথ্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। বরং বিনিয়োগকারীকে একসঙ্গে কয়েকটি প্রশ্ন করতে হবে: ঋণটি কোথায় ব্যবহার হচ্ছে? নতুন কারখানা, উৎপাদনক্ষমতা বা লাভজনক প্রকল্পে যাচ্ছে, নাকি পুরোনো ঋণের সুদ ও চলতি খরচ সামলাতে ব্যবহার হচ্ছে? কোম্পানির EBIT বাড়ছে কি না? ইন্টারেস্ট কভারেজ কত? ঋণের বড় অংশের সুদ স্থির, নাকি বাজারভিত্তিক? আগামী এক-দুই বছরে কত ঋণ পরিশোধ করতে হবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানির ব্যবসা থেকে যে নগদ টাকা আসছে, তা কি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট?
শেষ পর্যন্ত ভালো কোম্পানি ঋণকে ব্যবহার করে, খারাপ কোম্পানি কখনো কখনো ঋণের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে দুটিকে বাইরে থেকে দেখতে একই রকম লাগতে পারে। তাই ঋণের পরিমাণ নয়, ঋণের বিপরীতে তৈরি হওয়া আয় ও নগদ প্রবাহই আসল গল্প। বাংলাদেশে এখন যখন বেসরকারি ঋণপ্রবাহ দুর্বল এবং ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে সতর্ক, তখন নতুন ঋণ নিয়ে সম্প্রসারণ করা কোনো কোম্পানির জন্য বড় সুযোগও হতে পারে। কিন্তু সেই ঋণ যদি উচ্চ সুদে নেওয়া হয় এবং প্রত্যাশিত বিক্রি বা মুনাফা না আসে, তাহলে একই ঋণ কয়েক বছরের মধ্যে কোম্পানির সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে। তাই ব্যালান্স শিটে ঋণ দেখলেই ভয় পাওয়ার দরকার নেই; বরং দেখতে হবে কোম্পানিটি ঋণকে কাজে লাগাচ্ছে, নাকি ঋণই এখন কোম্পানিকে চালাচ্ছে।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

