জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অধিবেশনের তৃতীয় দিনের বিকেলের আয়োজনে ১৮ জন বক্তার মধ্যে ১১তম বক্তা হিসেবে তিনি বক্তব্য দেন।
ভাষণে তিনি বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্ব শান্তি, নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানবিক সংকট এবং রোহিঙ্গা সমস্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলেন।
শুরুতেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতিকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বিদায়ী সভাপতির নেতৃত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের আন্দোলনে শহীদদের স্মরণ
ভাষণের শুরুতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তারেক রহমান। স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদেরও স্মরণ করেন তিনি।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর বাংলাদেশ নতুনভাবে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। জনগণই রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল উৎস—এমন বিশ্বাসের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সংঘাত নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং মানবিক সংকট বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সংঘাতের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়ছে বলে জানান তিনি।
তারেক রহমানের মতে, কোনো বিরোধের স্থায়ী সমাধান যুদ্ধের মাধ্যমে নয়; আলোচনা, কূটনীতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার পথেই তা সম্ভব। রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সমতা, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি এমন একটি বিশ্বের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে অস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তি, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবিকতাই পরিবর্তনের প্রধান মাধ্যম হবে।
ফিলিস্তিনের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত
স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সমর্থন আবারও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের অবিচল অবস্থানের কথা জানান তিনি।
একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির পরিবর্তে উন্নয়ন ও শান্তির দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার আহ্বান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বহুপাক্ষিকতার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের সদস্যরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশেষ করে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণকে নারীর অগ্রগতি, শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি দেশের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইল বাংলাদেশ
ভাষণে সবচেয়ে গুরুত্ব পাওয়া বিষয়গুলোর একটি ছিল রোহিঙ্গা সংকট।
প্রধানমন্ত্রী জানান, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়ে আসছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং সমাধানও সেখানেই করতে হবে। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়াকেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও কার্যকর ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনে ন্যায়বিচার দাবি
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান খুবই কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব দেশটিকে বহন করতে হচ্ছে।
এ কারণে জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন তিনি।
পরিবেশ রক্ষায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা ও খরা মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথা জানান তিনি।
সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ বাড়ানো, পানি সংরক্ষণ এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের কথাও ভাষণে উঠে আসে।
তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলার উদ্যোগ
বাংলাদেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য নতুন উদ্যোগের সুযোগ তৈরির কথাও জানান তিনি।
চলতি অর্থবছরে এ ধরনের উদ্যোগের জন্য ৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব
দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরে নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
নারীদের জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, অর্থনীতিতেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে চায় সরকার।
সামাজিক সুরক্ষায় বিভিন্ন কার্ড চালুর কথা
অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের সহায়তায় ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচির কথা ভাষণে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে পরিবারপ্রধান নারীর নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা ব্যবস্থাকে সমন্বিত করে একটি সর্বজনীন কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান।
শিক্ষা ও খেলাধুলায় নতুন উদ্যোগ
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকারের বিশেষ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ, পোশাক ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার কর্মসূচির কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে কর্মমুখী ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন।
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থায় খেলাধুলাকে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও জানান তিনি। এর অংশ হিসেবে গত জুনে সারাদেশে আয়োজিত মাসব্যাপী ফুটবল প্রতিযোগিতায় ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে বলে ভাষণে উল্লেখ করা হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল সবার কাছে পৌঁছানোর আহ্বান
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি ও নতুন বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের যুগে প্রবেশ করছে।
তবে প্রযুক্তির সুযোগ যেন শুধু উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ডিজিটাল বৈষম্য ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈষম্যে পরিণত না হয়—এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তারের সুফল যাতে মানবকল্যাণে কাজে লাগে, সে জন্য জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নেরও আহ্বান জানান তিনি।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর সহায়তা চান
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই উত্তরণকে টেকসই করতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ধারাবাহিক সহায়তা প্রয়োজন।
অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
ভবিষ্যতের বাংলাদেশের স্বপ্ন
ভাষণের শেষদিকে প্রধানমন্ত্রী এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা তুলে ধরেন, যেখানে তরুণরা নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাবে এবং প্রতিটি শিশু নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে দল, মত, ধর্ম বা বর্ণের পার্থক্য ছাড়াই সবাই সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারবে।
বিশ্ব মানবতার প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষণের শেষ বার্তা ছিল—“সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।”

