বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে এখন ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। গত মার্চে এ প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ। এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সময় এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে শিল্পে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হচ্ছে না। এসব কারণে ঋণের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
তাদের মতে, বর্তমান বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এমনকি সুদহার বিবেচনায় নিলে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। কারণ, প্রবৃদ্ধির হিসাব করা হয় সুদসহ সমন্বয় করে। মার্চে ব্যাংকগুলো গড়ে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। একই সময়ে আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। ফলে ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন এবং ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন, উচ্চ সুদহার এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি মিলিয়ে এ ধরনের অবস্থা তৈরি হয়েছে। তার মতে, ব্যবসায়ীরা এখন ঋণ নিতে আগ্রহী নন, যা সবচেয়ে বড় সংকেত। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, স্বল্পমেয়াদে বাজেটের মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ রয়েছে। বাজেটে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং বিনিয়োগ ও চাকরি সৃষ্টিতে প্রণোদনা রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি দেশে ব্যাংকের বাইরে বন্ড ও পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়নের বিকল্প এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়নি, যা উন্নয়ন করা দরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক ব্যবস্থায় বর্তমানে তারল্যের কোনো সংকট নেই। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বাজার থেকে প্রায় ৬১৪ কোটি ডলার কিনে ব্যাংকগুলোকে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সময়ে সরকারের ঋণও বাজেট সীমার মধ্যেই রয়েছে। তবুও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমছে।
এক সময় এই খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে ছিল। করোনাভাইরাসের সময় কলকারখানা বন্ধ হয়ে অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দেয়। ২০২০ সালে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশে। পরে আবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে তা দুই অঙ্কের কাছাকাছি পৌঁছে। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে আবার কমতে শুরু করে এবং ৯ দশমিক ৯০ শতাংশে নেমে আসে। গত বছরের মার্চে তা ছিল ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ, যা এখন আরও কমে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, আগের সরকারের সময়ে ঋণের একটি অংশের অপব্যবহার হয়েছে। ঋণ নিয়ে অর্থপাচার ও জালিয়াতির ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঋণ এখন অনাদায়ী হয়ে খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশের বেশি। ফলে যেসব বড় ঋণগ্রহীতা ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন হয় পলাতক, নয়তো কারাগারে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাবই এখন ঋণ প্রবৃদ্ধিতে পড়ছে।
অন্যদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে নীতি সুদহার কমানোর দাবি উঠলেও ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে তা ১০ শতাংশেই স্থির রয়েছে। ফলে ঋণ ব্যয় বেশি থাকায় নতুন বিনিয়োগ আরও মন্থর হয়ে পড়ছে।

