জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী দেশগুলোর কাঁধেই এখন সবচেয়ে বড় ক্ষতির ভার। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদনে ধাক্কা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশসহ দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই ক্ষতি মোকাবিলায় ধনী দেশগুলো যে ‘জলবায়ু অর্থায়ন সহায়তার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও বাস্তব চিত্র নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। কারণ এই অর্থের বড় অংশই এখন অনুদান নয়, বরং ঋণ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সহায়তার বদলে অনেক দেশ নতুন করে দেনার চাপে পড়ছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো জলবায়ু অর্থায়ন ১০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য ছাড়িয়ে ১১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। পরের বছর ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২৪ সালে এই অর্থায়ন আরও বেড়ে ১৩৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
এই অর্থ মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। অর্থ আসে উন্নত দেশের সরকার, বেসরকারি খাত এবং বিশ্বব্যাংকের মতো বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলো থেকে।
তবে পরিমাণ বাড়লেও বিতর্ক বাড়ছে অর্থের ধরন নিয়ে। ২০২৩ সালে সরকারি জলবায়ু অর্থায়নের ৭৩ শতাংশই ছিল ঋণ। ২০২৪ সালে তা কিছুটা কমে ৬৭ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এখনো দুই-তৃতীয়াংশের বেশি অর্থই উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণ হিসেবে নিতে হচ্ছে, যা পরে সুদসহ ফেরত দিতে হবে।
২০২৪ সালে সরকারি অর্থায়ন ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ১০১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তবে একই সময়ে বেসরকারি খাতের অবদান ৩৩ শতাংশ বেড়ে ৩০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। প্রতিবেদন তৈরির প্রধান রাফায়েল জাচনিক বলেন, ২০২৩ সালের বড় উল্লম্ফনের পর ২০২৪ সালে সরকারি অর্থায়ন আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এই অর্থায়নের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ফজলে রাব্বি ছাদেক আহমাদ বলেন, উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। তাঁর মতে, ঘোষিত অর্থের এক-চতুর্থাংশও বাস্তবে পাওয়া যায় না। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জলবায়ু ক্ষতির তুলনায় এই সহায়তা খুবই অপ্রতুল। পাশাপাশি হিসাবের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ গণনা এবং বাজারনির্ভর বিনিয়োগ যুক্ত করায় প্রকৃত চিত্র আরও অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এলইউসিসিসি’র টেকনিক্যাল লিড অধ্যাপক মিজান আর খান বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়নের দুই-তৃতীয়াংশই ঋণ হিসেবে আসে। ফলে দায়ী না হয়েও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোই এখন ক্ষতি সামাল দিতে ঋণের বোঝা বইছে। তাঁর মতে, এটি স্পষ্ট অন্যায়।
নাইরোবিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা পাওয়ার শিফট আফ্রিকার পরিচালক মোহাম্মদ আদো বলেন, জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী ধনী দেশগুলোই আবার দরিদ্র দেশগুলোকে ঋণ দিয়ে লাভ করছে। তিনি একে সরাসরি কেলেঙ্কারি বলে মন্তব্য করেন। জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধ চলছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোগ, ধনী দেশগুলো বারবার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
২০২৪ সালে আজারবাইজানে অনুষ্ঠিত কপ২৯ সম্মেলনে উন্নত দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে ৩০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার নতুন অঙ্গীকার করে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উৎস মিলিয়ে বছরে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতে, এই অঙ্কও প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা সতর্ক করেছে, বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে দাবি আরও জোরালো হচ্ছে যে জলবায়ু অর্থায়ন ঋণের বদলে অনুদান হিসেবে দিতে হবে। কারণ ক্ষতির দায় যাদের নয়, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক চাপ বহন করছে।
এশিয়ার দেশগুলো ২০২৪ সালে মোট জলবায়ু অর্থায়নের ৩৬ শতাংশ পেয়েছে। আফ্রিকা পেয়েছে ৩১ শতাংশ। তবে উভয় অঞ্চলেরই দাবি, সহায়তা ঋণ না হয়ে অনুদান হতে হবে।
এ বিষয়ে কপ৩১ সম্মেলনের মনোনীত সভাপতি তুরস্কের জলবায়ুমন্ত্রী মুরাত কুরুম জানিয়েছেন, দাতাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

