সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর পথে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। এই স্কিমের আইনগত ভিত্তি তৈরি করতে আইনের খসড়া প্রণয়ন করে জাতীয় সংসদে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ বৈঠকে শরিয়াহভিত্তিক সংস্করণ চালুর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এতে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান জানিয়েছেন, শরিয়াহভিত্তিক স্কিমের কাঠামো, পরিচালনপদ্ধতি, বিনিয়োগব্যবস্থা ও অন্যান্য কারিগরি বিষয় নির্ধারণের কাজ চলছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকরা এ বিষয়ে কাজ করছেন।
সহজভাবে বলতে গেলে, শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে পেনশন তহবিলের অর্থ ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী বিনিয়োগ করা হবে। এর অর্থ হলো, সুদভিত্তিক বিনিয়োগ, জুয়া, মদ, তামাক বা শরিয়াহ-নিষিদ্ধ অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগ করা যাবে না। বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ রয়েছেন যারা সুদভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থায় অংশ নিতে অনীহা বোধ করেন। শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালু হলে সেই জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বজনীন পেনশনে অংশগ্রহণের নতুন দরজা খুলবে। ড. সুরাতুজ্জামান বলেছেন, ‘শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের মাধ্যমে যদি এই স্কিম পরিচালনা করা যায়, তাহলে দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা সম্ভব হবে।’ আইনগত ও কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগনীতির ভিত্তিতে নতুন এ স্কিম চালু হলে সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থায় একটি পৃথক বিনিয়োগ ও পরিচালনা কাঠামো যুক্ত হবে।
শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালুর পাশাপাশি বিদ্যমান সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারীদের জন্যও বেশ কিছু সুবিধা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পেনশনার মারা গেলে তার স্বামী বা স্ত্রী কিংবা নির্ধারিত সুবিধাভোগীর পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা ৭৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়েছে। ড. সুরাতুজ্জামান জানিয়েছেন, পেনশনার নিজে জীবদ্দশায় আজীবন পেনশন সুবিধা পাবেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর স্বামী বা স্ত্রী ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত এই সুবিধা পাবেন। এছাড়া বৈঠকে পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর অংশগ্রহণকারীরা জমা করা পুরো অর্থ তুলে নিয়ে কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একটি প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি; শারীরিক বা আর্থিক অক্ষমতার মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে এই সুবিধা দেওয়ার শর্ত নির্ধারণ করে বিস্তারিত প্রস্তাব পরে পর্ষদের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সর্বজনীন পেনশন তহবিলের বিনিয়োগের বিপরীতে গ্রাহকদের মুনাফার হার বাড়ানো হয়েছে। আগের ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ মুনাফা দেওয়া হয়েছিল। ড. সুরাতুজ্জামান বলেছেন, পেনশন তহবিলের বিনিয়োগ ও আয়-ব্যয়ের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া পেনশন কর্মসূচির সঙ্গে স্বাস্থ্যবীমা যুক্ত করার বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোন মডেলে স্বাস্থ্যবীমা চালু করা যেতে পারে এবং এতে পেনশন তহবিলের ওপর কী ধরনের আর্থিক প্রভাব পড়বে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে পেনশনের মুনাফা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে, তবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতা আরও বাড়াতে সরকারি মালিকানাধীন যেসব প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির কর্মীরা প্রচলিত সরকারি পেনশন সুবিধা পান না, তাদের ‘প্রগতি’ স্কিমের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ড. সুরাতুজ্জামান জানিয়েছেন, এসব কর্মীর অবসর-সুবিধা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির চাকরি বিধি ও নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে; তারা সরকারি সিভিল কর্মচারীদের মতো রাষ্ট্রীয় পেনশন পান না। এই শূন্যতা পূরণে তাদের প্রগতি স্কিমে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে এই ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং কী প্রক্রিয়ায় তা বাস্তবায়ন করা হবে, তা পরবর্তী সময়ে নির্ধারণ করা হবে। এছাড়া প্রবাসীদের সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বাড়াতে বিদেশে যাওয়ার সময়ই তাদের ‘প্রবাস’ স্কিম সম্পর্কে জানানো এবং নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় বর্তমানে প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাস; এই চারটি স্কিম চালু রয়েছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শুরু পর্যন্ত চারটি স্কিমে মোট নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার। তাদের জমা করা মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ‘সমতা’ স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন এবং তাদের জমা করা অর্থের পরিমাণ ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। প্রবাসীদের জন্য চালু করা ‘প্রবাস’ স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ১ হাজার ১৭১ জন এবং এ স্কিমে মোট জমা হয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। নতুন গ্রাহক বাড়াতে নিবন্ধন কার্যক্রমে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রণোদনা ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে। পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার বিষয়ে আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি; অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় শরিয়াহভিত্তিক স্কিম শুধু নতুন একটি স্কিম সংযোজনের উদ্যোগ নয় বরং বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থার বিনিয়োগ কাঠামো, অংশগ্রহণের পরিধি ও সুবিধার ধরন আরও বিস্তৃত করার চলমান উদ্যোগের অংশ। আইনগত কাঠামো চূড়ান্ত করে জাতীয় সংসদে পাঠানো এবং পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ওপরই এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত হবে এবং শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশন সুবিধা নিতে আগ্রহী জনগোষ্ঠীর জন্য অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

