স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ এবং টেকসই উত্তরণ এক বিষয় নয়। এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি দেশের উন্নয়নযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত না করে বরং আরও শক্তিশালী করতে হবে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত ‘এলডিসি-জিআইএফ মেকানিজম ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড হাই-লেভেল ডায়ালগ’-এ অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এই মন্তব্য করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, উত্তরণ মানে শুধু একটি সূচকের পরিবর্তন নয়, বরং অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর, উৎপাদন সক্ষমতার উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা।
ড. তিতুমীর তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেছেন, উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলো এখনো কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা এবং সীমিত উৎপাদন সক্ষমতার মুখোমুখি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভূরাজনৈতিক সংঘাত, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, বাণিজ্য অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ নানা অভিঘাত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের মূল সময়সূচি ছিল চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারি, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের কারণে সরকার এই প্রস্তুতিমূলক সময় আরও তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করেছে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশের প্রস্তুতিমূলক সময় ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং অন্যান্য বাণিজ্য ছাড় হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
এলডিসি উত্তরণে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তি হস্তান্তরের ঘাটতি। ড. তিতুমীর তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, প্রয়োজনের তুলনায় এসব দেশে প্রযুক্তি হস্তান্তর এখনো অপ্রতুল। উন্নত দেশগুলো থেকে প্রতিশ্রুত প্রযুক্তি সহায়তা বাস্তবে পরিণত হচ্ছে না। কপিরাইট, পেটেন্ট এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষার নামে উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তি হস্তান্তরে অনীহা দেখাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর শিল্প খাতে কাঠামোগত রূপান্তরের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে গ্রিন টেকনোলজি এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি অত্যন্ত জরুরি।
ড. তিতুমীর আশা প্রকাশ করেছেন, এলডিসি গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন ফ্যাসিলিটেশন (এলডিসি-জিআইএফ) উদ্যোগ প্রযুক্তি হস্তান্তর ও শিল্পে এর প্রয়োগ ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা, কাঠামোগত রূপান্তর ও টেকসই উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোকে সবুজ শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরে সহায়তা করা। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে চীনের ভাইস প্রিমিয়ার এই উদ্যোগের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পৌঁছেছে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়, এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য সুবিধা, রেয়াতি ঋণ, এবং প্রযুক্তি সহায়তা পেয়ে আসছে। উত্তরণের পর এই সুবিধাগুলো ধীরে ধীরে কমে আসবে। বিশেষ করে ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশ সুবিধা হারালে দেশের তৈরি পোশাক খাতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। এছাড়া ওষুধ শিল্পে ট্রিপস ছাড় শেষ হলে পেটেন্টযুক্ত ওষুধ উৎপাদনে রয়্যালটি দিতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। ড. তিতুমীরের আহ্বান, শিল্পায়ন, সমন্বিত উদ্যোগ, জ্বালানি রূপান্তর ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে একটি মসৃণ, টেকসই ও অপরিবর্তনীয় উত্তরণ নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সহায়তা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণকে সফল করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। প্রথমত, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, সবুজ শিল্পায়নের দিকে এগোতে হবে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে। ড. তিতুমীরের এই আহ্বান শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং বিশ্বের অন্যান্য উত্তরণশীল দেশগুলোর জন্যও প্রাসঙ্গিক। এখন দেখার বিষয়, এলডিসি-জিআইএফ উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং বাংলাদেশ সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারে।

