বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বর্তমানে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেই। কিন্তু বাংলাদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন—সব ধরনের জ্বালানি তেলের খুচরা মূল্য পৌঁছেছে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং দেশের বাজারে নতুন মূল্য নির্ধারণ নিয়ে এরই মধ্যে অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
চলতি মাসে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ প্রায় ১১০ ডলারে উঠেছিল। তবে এই দাম চলতি বছরের এপ্রিলের রেকর্ড কিংবা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সময়কার সর্বোচ্চ মূল্যের তুলনায় অনেক কম।
অতীতে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যখন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখনই বাংলাদেশে বড় ধরনের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। কিন্তু এবার বিশ্ববাজারে সেই পর্যায়ের মূল্য পরিস্থিতি তৈরি না হলেও দেশে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম একসঙ্গে প্রতি লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
চলতি বছর এ নিয়ে তিন দফায় জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর ফলে এপ্রিলের আগের তুলনায় বর্তমানে ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা, কেরোসিন ৪৩ টাকা, পেট্রল ৪৪ টাকা এবং অকটেন ৪৫ টাকা। অর্থাৎ আগের দামের তুলনায় এসব জ্বালানির মূল্য প্রায় ৩৫ থেকে ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা। কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা, পেট্রলের দাম ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়েছে।
শতাংশ হিসাবে ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ, কেরোসিন ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ, পেট্রল ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং অকটেন ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
তবে এই মূল্যবৃদ্ধির সময় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল না। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে চলতি মাসের মাঝামাঝি ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১০ ডলারে উঠলেও ১৮ সেপ্টেম্বর তা কমে ১০৪ ডলারে নেমে আসে। পরবর্তী সময়ে গতকাল রাত ৯টার দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রায় ৯৯ ডলার।
অর্থাৎ বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন রেকর্ড পর্যায়ে নেই, তখনই দেশের বাজারে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২০০৮ বা ২০২২ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মতো নয়। তবে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ভিত্তিতে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আর্থিক চাপ এবং সরকারের ভর্তুকি ব্যবস্থাপনাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তিনি মনে করেন, একবারে সব ধরনের জ্বালানির দাম একই পরিমাণে না বাড়িয়ে আরও ধাপে ধাপে এবং লক্ষ্যভিত্তিকভাবে মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ ছিল।
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট পেট্রোলিয়াম পণ্য ব্যবহারের প্রায় ৬৪ শতাংশই ডিজেল। পরিবহন, কৃষি এবং বিভিন্ন উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডে এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং কৃষি উৎপাদন, পণ্য পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং বাজার ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়বে।
তার মতে, ভর্তুকি কমানোর প্রয়োজন থাকলে সেটি ধাপে ধাপে করা যেত। পাশাপাশি জ্বালানির ওপর বিদ্যমান কর ও শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনার সুযোগও ছিল।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছিল। তখন ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৪৪ ডলারে পৌঁছায়। ১৭ এপ্রিল ব্রেন্টের ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য প্রায় ৯০ ডলারে নেমে এলেও সেই সময়ের সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অস্থির।
২০২২ সালের জ্বালানি সংকটের সময়ও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের মূল্য বৃদ্ধি হয়েছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ৭ মার্চ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩৯ দশমিক ১৩ ডলারে পৌঁছায়, যা ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ ছিল।
সে সময় দেশে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ছিল প্রতি লিটার ৮০ টাকা, পেট্রল ৮৬ টাকা এবং অকটেন ৮৯ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির কয়েক মাস পর ২০২২ সালের ৬ আগস্ট দেশে বড় ধরনের মূল্য সমন্বয় করা হয়।
তখন ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৪ টাকা, পেট্রল ৮৬ টাকা থেকে ১৩০ টাকা এবং অকটেন ৮৯ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়। এটি ছিল দেশের ইতিহাসে একবারে সবচেয়ে বড় জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা।
২০০৮ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। ওই বছর জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৪৭ দশমিক ৫ ডলারে পৌঁছায়, যা তখনকার সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল। এরপর বাংলাদেশেও জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের বড় মূল্যবৃদ্ধির সময় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে ছিল। কিন্তু এবার বিশ্ববাজার সেই পর্যায়ে না উঠলেও দেশের বাজারে জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তবে সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান এবং ভর্তুকির বোঝা কমাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান বহন করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয় না করায় প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
সরকারের দাবি, ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সামাজিক নিরাপত্তাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানির দাম নির্ধারণে শুধু আন্তর্জাতিক বাজার নয়, দেশের ভেতরের কর কাঠামো, পরিচালন ব্যয়, বিপিসির দক্ষতা এবং মূল্য সমন্বয়ের পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের মতে, দীর্ঘ সময় দাম অপরিবর্তিত রেখে হঠাৎ বড় ধরনের মূল্য বৃদ্ধি করলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বেশি পড়ে। নিয়মিত ও ছোট পরিসরে মূল্য সমন্বয় করা হলে অর্থনীতিতে আকস্মিক ধাক্কা কমানো সম্ভব।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল হওয়ার পর দেশের বাজারেও কি তার প্রতিফলন দেখা যাবে, নাকি নতুন মূল্যস্তর দীর্ঘস্থায়ী হবে। কারণ জ্বালানি তেলের দাম শুধু পরিবহন নয়, দেশের প্রায় প্রতিটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

