বিশেষ বিশ্লেষণ
জনতা ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি এবং তার সঙ্গে ঢাকাই চলচ্চিত্র জগতের এক প্রযোজকের নাম জড়িয়ে যাওয়ার খবর গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বারবার এসেছে। ভুয়া রপ্তানি নথি বানিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা বের করা, সেই টাকায় সিনেমা বানানো, উঠতি তারকাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা; এসব খণ্ড খণ্ড খবর আলাদাভাবে পড়লে মনে হতে পারে এটা নিছক একজন বিতর্কিত ব্যবসায়ীর গল্প। কিন্তু ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, এটা আসলে একটা নির্দিষ্ট কাঠামো মেনে চলা অপরাধ, যাকে আন্তর্জাতিক অর্থপাচার-বিরোধী সংস্থাগুলো (যেমন FATF) নাম দিয়েছে “প্লেসমেন্ট-লেয়ারিং-ইন্টিগ্রেশন” মডেল। আজকের লেখায় ঘটনাটাকে ঠিক এই কাঠামোর ভেতর দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি; কোনটা প্রমাণিত তথ্য, আর কোনটা এখনও অভিযোগের পর্যায়ে, সেই সীমারেখাটাও স্পষ্ট রেখে।
সংখ্যাগুলো আগে জেনে নেওয়া যাক
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলার তথ্য অনুযায়ী, ক্রিসেন্ট গ্রুপ ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় ৩ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতি ও খেলাপি করে, যার একটা বড় অংশ বিদেশে সরিয়ে ফেলা হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ আছে। এই মামলায় ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ কাদের, তাঁর ভাই ও জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার এম এ আজিজ এবং আরও ১৩ জনসহ মোট ২২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এর বাইরে আরেকটি মামলায় নির্দিষ্টভাবে ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় এই দুই ভাই ও আরও ২০ জনের বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে গণমাধ্যমে প্রকাশিত আরেকটি মামলায় এম এ কাদের ও আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে প্রায় ৯১৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ আনা হয়। এই সংখ্যাগুলো একসঙ্গে রাখলে বোঝা যায়, কেন জনতা ব্যাংক ২০২০ সালে প্রায় ৫ হাজার ৫৪ কোটি টাকা নিট লোকসানে পড়ে যায়; মূলত ক্রিসেন্ট ও অ্যানানটেক্স গ্রুপের ঋণ অনিয়ম ও অর্থপাচারের কারণে।
প্রথম ধাপ: “প্লেসমেন্ট” (টাকা ব্যাংক থেকে বের করার কৌশল)
অর্থপাচার বিশ্লেষণে প্রথম ধাপ হলো প্লেসমেন্ট। অবৈধ টাকাকে প্রথমবারের মতো আর্থিক ব্যবস্থার ভেতরে ঢোকানো বা বের করে আনা। এই ক্ষেত্রে সেই কাজটা হয়েছে ভুয়া রপ্তানি নথি ও এলসির মাধ্যমে। তদন্তে দেখা গেছে, প্রকৃত ক্রেতা বা প্রকৃত পণ্য চালান ছাড়াই কাগুজে রপ্তানি দেখিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এ নির্ধারিত একক গ্রাহক ঋণসীমা লঙ্ঘন করেও ঋণ দেওয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষায় উঠে এসেছে। যেমন অ্যানানটেক্স গ্রুপের ২২টি কোম্পানিকে ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে জনতা ব্যাংক থেকে দেওয়া হয় প্রায় ৩ হাজার ৫২৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা ব্যাংকটির মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি। এই পর্যায়ে যাঁরা সরাসরি ঋণের কাগজে স্বাক্ষর করেন, ব্যাংক হিসাব যাঁদের নামে খোলা হয়, তাঁরাই আইনি ঝুঁকির প্রথম স্তরে থেকে যান কারণ নথিপত্রে নাম তো তাঁদেরই।
দ্বিতীয় ধাপ: “লেয়ারিং” (টাকাকে বৈধ চেহারা দেওয়ার চেষ্টা)
টাকার অঙ্কটা এত বড় যে শুধু জমি কিনে বা নগদ জমিয়ে রাখাটা বাস্তবসম্মত নয়, কারণ বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন নিজেই সন্দেহজনক লেনদেন হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। তাই অর্থপাচারের সাধারণ কাঠামোতে দ্বিতীয় ধাপ হলো লেয়ারিং। টাকাকে একাধিক স্তরের লেনদেনের মধ্য দিয়ে ঘুরিয়ে তার উৎস আড়াল করা। বিনোদন শিল্প এই কাজের জন্য বিশ্বজুড়েই একটা পরিচিত মাধ্যম, কারণ চলচ্চিত্র প্রযোজনার ব্যয় নির্ধারণ করা কঠিন, নগদ লেনদেন স্বাভাবিক, আর লাভ-ক্ষতির হিসাব অস্বচ্ছ থাকাটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। আন্তর্জাতিক অর্থপাচার-বিরোধী সংস্থাগুলো একেই বলে “কাস্ক-ইনটেনসিভ” খাত, যা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত। এই মামলার প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, জাজ মাল্টিমিডিয়ার নামে একাধিক সিনেমা প্রযোজনার পাশাপাশি বিদেশেও অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগ এসেছে গণমাধ্যমে, যদিও প্রতিটি লেনদেনের নির্দিষ্ট উৎস আদালতে এখনও চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
তৃতীয় ধাপ: “ইন্টিগ্রেশন” (সম্পদ ও সম্পর্কের মধ্য দিয়ে টাকা মিশিয়ে ফেলা)
শেষ ধাপ হলো ইন্টিগ্রেশন। পাচার হওয়া টাকাকে একদম স্বাভাবিক, বৈধ সম্পদের মতো দেখানো। এই ধাপে সাধারণত বিলাসবহুল সম্পদ কেনা, উপহার দেওয়া বা সামাজিকভাবে প্রভাবশালী মানুষদের মাধ্যমে সেই টাকা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কারণ, এতে টাকার আসল মালিক এক ধাপ পেছনে সরে যান। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে একাধিকবার প্রতিবেদন এসেছে যে জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আব্দুল আজিজ ঢালিউডের একাধিক পরিচিত মুখের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও বিতর্কে জড়িয়েছেন, এমনকি বিদেশি অভিনয়শিল্পীকেও অনুমোদনহীনভাবে টাকা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বলে চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এখানে স্পষ্ট করে বলা দরকার, কে সচেতনভাবে অবৈধ টাকা গ্রহণ করেছেন, আর কে নিছক পেশাগত সম্পর্কের কারণে জড়িয়ে পড়েছেন, সেই তদন্ত এখনো চূড়ান্ত রায়ের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই আমার নিজের বিশ্লেষণী অবস্থান হলো, “অ্যাসেট প্রক্সি” তত্ত্বটা এই মামলার প্যাটার্ন বোঝার জন্য একটা কার্যকর কাঠামো, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত বলে দাবি করার সুযোগ এখনও নেই।
কেন গডফাদাররা আড়ালে থাকেন, প্রক্সিরাই প্রথমে ধরা পড়েন
এই পুরো কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটা এখানেই। ফরেনসিক অডিট বা তদন্ত যখন শুরু হয়, তখন তদন্তকারীরা প্রথমে যা খোঁজেন তা হলো কাগজপত্র। ঋণের আবেদনে কার স্বাক্ষর, এলসিতে কার নাম, ব্যাংক হিসাবের মালিক কে। বাংলাদেশ ব্যাংক কোম্পানি আইন বা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর অধীনে দায় নির্ধারণ করা হয় মূলত নথিভিত্তিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে। আর নথিতে নাম থাকে যিনি সরাসরি স্বাক্ষর করেছেন, প্রকৃত সিদ্ধান্তদাতা নন। এই কারণেই আইনি প্রক্রিয়ায় প্রথম সারিতে আসে এম এ কাদের বা আব্দুল আজিজের মতো নাম, যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে ঋণের কাগজে জড়িত ছিলেন। দুদকের মামলা, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদন, আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা; সবকিছুই এই দুই ভাইয়ের নামে এসেছে, যদিও পুরো নেটওয়ার্কে আরও অনেকে জড়িত থাকার আশঙ্কা তদন্তকারীরাও উড়িয়ে দেননি।
যা প্রমাণিত, আর যা এখনও অভিযোগ; এই সীমারেখাটা মনে রাখা জরুরি
একজন পাঠক হিসেবে এই ধরনের খবর পড়ার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো প্রমাণিত তথ্য আর অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য করা। এটা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে জনতা ব্যাংক থেকে ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ খেলাপি করেছে, দুদক একাধিক মামলা দায়ের করেছে, আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে এবং আব্দুল আজিজ ২০১৯ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে আত্মগোপনে ছিলেন। কিন্তু “সেই টাকা দিয়ে ঠিক কোন কোন তারকাকে কী উপহার দেওয়া হয়েছে” বা “প্রতিটি সিনেমার প্রতিটি টাকার উৎস অবৈধ ছিল কি না” এই স্তরের নির্দিষ্ট বিবরণ এখনও তদন্তাধীন বা আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়। একটা বিশ্লেষণী প্রতিবেদন হিসেবে দায়িত্ব হলো কাঠামোটা পাঠককে বুঝিয়ে দেওয়া, কিন্তু অপ্রমাণিত অংশকে প্রমাণিত সত্যের মতো উপস্থাপন না করা।
শেষ কথা: প্যাটার্নটা চেনা থাকলে পরেরবার ধরা সহজ হয়
জনতা ব্যাংকের এই ঘটনা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে ও পরে একই ধরনের প্যাটার্নে আরও একাধিক ঋণ কেলেঙ্কারি হয়েছে, শুধু মাধ্যম বদলেছে। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা হওয়া উচিত, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কি এই “প্লেসমেন্ট-লেয়ারিং-ইন্টিগ্রেশন” প্যাটার্নটা আগেভাগে চিনতে পারার মতো ব্যবস্থা তৈরি করতে পারছে, নাকি প্রতিবারই ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর ফরেনসিক অডিট দিয়ে পেছন ফিরে তাকাতে হচ্ছে। একক গ্রাহক ঋণসীমা কঠোরভাবে পালন, রপ্তানি নথির স্বয়ংক্রিয় ক্রস-ভেরিফিকেশন এবং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নগদ-নির্ভর খাতে (যেমন বিনোদন শিল্প) সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদনের ব্যবস্থা কঠোর করা। এই তিনটা কাঠামোগত পদক্ষেপ ছাড়া শুধু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে এই চক্র বন্ধ করা কঠিন, কারণ কাঠামো একই থাকলে নতুন প্রক্সি আর নতুন গল্প নিয়ে একই খেলা আবার শুরু হতে পারে।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

