বিশেষ বিশ্লেষণ
কোম্পানির মুনাফা বেড়েছে, শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস-ও বেড়েছে; তবু শেয়ারের দাম আগের জায়গাতেই। এমন ঘটনা দেখলে অনেক বিনিয়োগকারী স্বাভাবিকভাবেই ভাবেন, “লাভ যখন বাড়ছে, শেয়ারের দাম বাড়বে না কেন?” কিন্তু পুঁজিবাজারের হিসাব এত সরল নয়। কারণ শেয়ারের দাম আজকের ইপিএস দেখে ঠিক হয় না; বাজার মূলত হিসাব করে আগামী দিনে কোম্পানিটি কত আয় করতে পারবে, সেই আয়ের মান কেমন হবে এবং সেই ভবিষ্যতের জন্য কত দাম দেওয়া যুক্তিসংগত। তাই কোনো কোম্পানির ইপিএস ২০ শতাংশ বাড়লেও শেয়ারের দাম না বাড়া অস্বাভাবিক নয়। বরং অনেক সময় বাজারের কাছে আসল খবর হলো ইপিএস বেড়েছে কি না নয়, বাজার যতটা বাড়ার আশা করেছিল তার চেয়ে বেশি বেড়েছে কি না।
ভালো ফলাফলও কখনো ভালো খবর নয়
ধরা যাক, একটি কোম্পানি গত বছর শেয়ারপ্রতি ১০ টাকা আয় করেছে। এবার সেটি বেড়ে ১২ টাকা হলো। অর্থাৎ ইপিএস বেড়েছে ২০ শতাংশ। কাগজে-কলমে এটি নিঃসন্দেহে ভালো খবর। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা যদি আগে থেকেই ধরে নিয়ে থাকেন যে কোম্পানিটির ইপিএস ১৫ টাকা হবে, তাহলে ১২ টাকা আসলে প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল ফলাফল। বাজার তখন “২০ শতাংশ বেড়েছে” এই খবরের চেয়ে “প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়েছে” বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে।
এখানেই আর্নিংজ আর এক্সপেক্টেশন-এর পার্থক্য। শেয়ারবাজারে অনেক তথ্য আগেই দামের মধ্যে ঢুকে যায়। কোনো কোম্পানি ভালো করবে, এই ধারণা যদি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগে থেকেই তৈরি হয়, তাহলে সেই আশায় শেয়ার কেনাবেচা শুরু হতে পারে ফলাফল প্রকাশের আগেই। ফলে ভালো ফলাফল প্রকাশের দিন নতুন কোনো চমক না থাকলে শেয়ারের দাম নাও নড়তে পারে। অর্থাৎ বাজার কখনো কখনো ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করে না; ফলাফল আসার আগেই তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন করে ফেলে।
আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও প্রত্যাশিত আয়ের তুলনায় প্রকৃত আয়ের পার্থক্যকে শেয়ারদামের গতিবিধির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু ইপিএস বাড়ল কি না, বরং বাজারের প্রত্যাশার তুলনায় ফলাফল কেমন হলো, এটিও বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ।
বাজার আসলে আজকের ইপিএস কিনছে না
এখানে একটি বিষয় বুঝে নেওয়া খুব জরুরি। একজন বিনিয়োগকারী যখন একটি শেয়ার কেনেন, তিনি শুধু কোম্পানির আজকের লাভের অংশ কিনছেন না; তিনি মূলত কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয় ও নগদপ্রবাহের ওপর একটি মূল্য নির্ধারণ করছেন। তাই বর্তমান ইপিএস বাড়লেও যদি বাজার মনে করে আগামী কয়েক বছরে প্রবৃদ্ধি কমে যাবে, তাহলে শেয়ারের মূল্য বাড়ার বদলে স্থিরও থাকতে পারে।
এটি বোঝার সহজ উপায় হলো পি/ই বা প্রাইস-টু-ইয়ার্নিং রেশিও। কোনো কোম্পানির শেয়ার ২০০ টাকা এবং ইপিএস ২০ টাকা হলে পি/ই ১০। এখন ইপিএস বেড়ে ২৫ টাকা হলো। যদি বাজার একই সময় এ ১০ গুণ পি/ই দিতে রাজি থাকে, তাহলে তাত্ত্বিকভাবে শেয়ারের দাম ২৫০ টাকা হতে পারে। কিন্তু বাজার যদি একই সময়ে মনে করে কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি আগের মতো থাকবে না বা ঝুঁকি বেড়েছে, তাহলে পি/ই ১০ থেকে ৮-এ নেমে আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে শেয়ারের মূল্য দাঁড়াবে ২০০ টাকা অর্থাৎ ইপিএস ২৫ শতাংশ বাড়লেও শেয়ারের দাম এক টাকাও না বাড়তে পারে।
এখানেই বাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলা। ইপিএস হলো আয়; কিন্তু শেয়ারের দাম নির্ভর করে সেই আয়ের জন্য বাজার কত গুণ দাম দিতে রাজি। পি/ই -এর মৌলিক বিশ্লেষণেও প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি, ঝুঁকি এবং পেআউট রেশিও-কে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে ধরা হয়। প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি কমলে বা ঝুঁকি বাড়লে একই ইপিএস-এর জন্য বাজার কম মূল্য দিতে পারে।
ইপিএস বাড়ল, কিন্তু বাজার কেন সন্দেহ করল?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ইপিএস বাড়ল কীভাবে? কারণ সব ধরনের আর্নিংজ গ্রোথ সমান মানের নয়।
ধরা যাক, একটি কোম্পানির মূল ব্যবসা থেকে আয় তেমন বাড়েনি। কিন্তু কোনো সম্পদ বিক্রি করে এককালীন বড় লাভ হয়েছে। সেই লাভে নিট আয় বেড়ে গেল এবং ইপিএস-ও বাড়ল। হিসাবের খাতায় ইপিএস অবশ্যই বেড়েছে। কিন্তু একজন বিচক্ষণ বিনিয়োগকারী তখন জানতে চাইবেন, “আগামী বছরও কি এই আয় থাকবে?” যদি উত্তর হয় না, তাহলে বর্তমান ইপিএস বৃদ্ধিকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী ইঙ্গিত হিসেবে দেখা কঠিন।
এই কারণেই শুধু ইপিএস-এর সংখ্যা দেখলে চলবে না; আর্নিংজ-এর কোয়ালিটি বা মানও দেখতে হবে। কোম্পানির মূল ব্যবসার বিক্রি কতটা বেড়েছে, অপারেটিং প্রফিট কী করেছে, নগদপ্রবাহ কেমন, ঋণের সুদ কতটা চাপ তৈরি করছে এবং এককালীন কোনো আয় মুনাফাকে ফুলিয়ে দিয়েছে কি না, এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক বিবরণীতে ইপিএস -এর পাশাপাশি ন্যাভ এবং এনওসিএফপিএস-ও প্রকাশের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ ইপিএস -এর সঙ্গে নগদপ্রবাহের চিত্রও দেখার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এখানে বিনিয়োগকারীর জন্য আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাজেশন হলো, “ ইপিএস বেড়েছে” একটি তথ্য; “ইপিএস কেন বেড়েছে” একটি বিশ্লেষণ। এই দ্বিতীয় প্রশ্নটিই অনেক সময় শেয়ারের ভবিষ্যৎ দিক বুঝতে বেশি কাজে দেয়।
প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলও কেন দাম বাড়ায় না?
এবার আরও কঠিন পরিস্থিতি ধরুন। কোম্পানি ২০ টাকা ইপিএস করল, যেখানে বাজারের প্রত্যাশা ছিল ১৮ টাকা। অর্থাৎ আর্নিংজ স্যারপ্রাইজ ইতিবাচক। তবু শেয়ারের দাম বাড়ল না। কেন?
কারণ বাজার শুধু ইপিএস-এর দিকে তাকিয়ে নেই। একই সময়ে হয়তো সুদের হার বেড়েছে, পুরো বাজারে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমেছে, কোম্পানির ভবিষ্যৎ গাইডেন্স দুর্বল, ঋণের বোঝা বেড়েছে, ডিভিডেন্ট কমেছে অথবা ব্যবস্থাপনা আগামী বছর মুনাফা কমার ইঙ্গিত দিয়েছে। এমনকি ইপিএস ভালো হলেও যদি বিনিয়োগকারীরা মনে করেন এই আয় টেকসই নয়, তাহলেও দাম স্থির থাকতে পারে।
আরেকটি বিষয় হলো ভ্যালুয়েশন। ধরুন, একটি কোম্পানি ইতিমধ্যেই ৩০ গুণ পি/ই-তে লেনদেন করছে। বাজার তার কাছ থেকে অসাধারণ প্রবৃদ্ধি আশা করছে। সেখানে ইপিএস ১০ শতাংশ বাড়া হয়তো যথেষ্ট নয়। কিন্তু একই ১০ শতাংশ ইপিএস বৃদ্ধি যদি ৮ গুণ পি/ই-তে থাকা একটি স্থিতিশীল কোম্পানির ক্ষেত্রে আসে, বাজারের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে। অর্থাৎ একই ইপিএস গ্রোথ, ভিন্ন ভ্যালুয়েশন – ভিন্ন শেয়ারদাম।
এ কারণেই শুধু “কোম্পানির ইপিএস ৩০ শতাংশ বেড়েছে” শুনে শেয়ার সস্তা বা আকর্ষণীয় ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। প্রশ্ন করতে হবে, এই প্রবৃদ্ধির জন্য বাজার ইতিমধ্যে কত দাম দিয়ে ফেলেছে?
বাজারের চোখ সামনে, হিসাবের খাতা পেছনে
পুঁজিবাজারের আরেকটি বৈশিষ্ট্য এখানেই। কোম্পানি যে ফলাফল প্রকাশ করে, সেটি মূলত অতীতের হিসাব। কিন্তু শেয়ারের দাম ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়। আজ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনের ইপিএস গত অর্থবছরের ফলাফল সম্পর্কে বলছে; বাজারের বিনিয়োগকারী মিনহোয়াইল ভাবছেন আগামী দুই, তিন বা পাঁচ বছরে কোম্পানির আয় কোথায় যাবে।
তাই একটি কোম্পানির ইপিএস বাড়লেও যদি বাজার মনে করে এই প্রবৃদ্ধি সাময়িক, তাহলে দাম বাড়বে না। বিপরীতে ইপিএস সামান্য বাড়লেও যদি বাজার হঠাৎ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সামনে বড় প্রবৃদ্ধির সময় আসছে, তখন শেয়ারের দাম আর্নিংজ-এর চেয়েও দ্রুত বাড়তে পারে।
এখানে বাজারের প্রত্যাশা অনেকটা দামের ভেতরে থাকা অদৃশ্য সংখ্যার মতো। আপনি আর্থিক বিবরণীতে সেই সংখ্যা সরাসরি দেখতে পাবেন না। কিন্তু পি/ই, বাজারদর, অ্যানালিস্ট এক্সপেকটেশন, ডিভিডেন্ড পলিসি ইন্ডাস্ট্রি গ্রোথ এবং কোম্পানির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী ধরনের মূল্যায়ন করছেন। দামোদারান-এর ভ্যালুয়েশন ফ্রেমওয়ার্ক-এও পি/ই-কে শুধু বর্তমান আর্নিংজ-এর গুণিতক হিসেবে নয়, বরং প্রত্যাশিত গ্রোথ, রিস্ক এবং পেআউট-এর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ভ্যালুয়েশন মাল্টিপল হিসেবে দেখা হয়।
তাহলে ইপিএস দেখবেন কীভাবে?
সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য বিষয়টি জটিল করার দরকার নেই। কোনো কোম্পানির ইপিএস বাড়তে দেখলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, গত বছরের তুলনায় কতটা বেড়েছে? দ্বিতীয় প্রশ্ন, বাজার আগে কতটা আশা করেছিল? তৃতীয় প্রশ্ন, মূল ব্যবসা থেকে আয় বেড়েছে, নাকি এককালীন কোনো কারণে ইপিএস বেড়েছে? এরপর দেখতে হবে অপারেটিং ক্যাস ফ্লো, ঋণ, ডিভিডেন্ট এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা।
এর সঙ্গে পি/ই -ও দেখতে হবে। তবে পি/ই কম মানেই শেয়ার সস্তা; এমন ধারণাও ঠিক নয়। কোনো কোম্পানির পি/ই কম হতে পারে কারণ বাজার তার প্রবৃদ্ধি কম মনে করছে বা ঝুঁকি বেশি দেখছে। আবার বেশি পি/ই -ও সবসময় অতিমূল্যায়ন বোঝায় না; উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা থাকলে বাজার বেশি মাল্টিপল দিতে পারে। তাই ভ্যালুয়েশন-এর কোনো একটি অনুপাতকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এই বিশ্লেষণ আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক ফলাফল প্রকাশ এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য ইপিএস, ন্যাভ ও নগদপ্রবাহের মতো সূচক প্রকাশের একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো রয়েছে। বিএসইসি তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক বিবরণী, সময়মতো প্রকাশ এবং প্রাইস-সেনসিটিভ ইনফরমেশন পর্যবেক্ষণও করে। ফলে একজন বিনিয়োগকারীর জন্য তথ্য আছে; আসল চ্যালেঞ্জ হলো সেই তথ্যের মধ্যে কোনটি অতীতের হিসাব আর কোনটি ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের ইঙ্গিত; সেটা আলাদা করা।
শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে একটি ভালো সংখ্যাকে একটি ভালো বিনিয়োগের সমার্থক ধরে নেওয়া। ইপিএস বাড়া অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু বাজারের প্রশ্ন আরও কঠিন, “এরপর কী?” আগামী বছর ইপিএস কত হতে পারে, এই আয় কতটা টেকসই, ঝুঁকি কতটা, ডিভিডেন্ট বা ক্যাশ ফ্লো কেমন এবং বর্তমান শেয়ারের দামে ভবিষ্যতের কতটা ভালো খবর ইতিমধ্যে ঢুকে আছে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আসলে শেয়ারের মূল্যায়নকে বদলায়।
তাই কোনো কোম্পানির ইপিএস বাড়ার খবর দেখে শেয়ার কিনব কি না, তার আগে আমি বরং একটি প্রশ্ন করব; “এই ভালো খবরটা কি বাজারের কাছেও নতুন?” যদি উত্তর হয় না, তাহলে ইপিএস বাড়লেও শেয়ারের দাম নড়বে না। এটাই পুঁজিবাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক সময় সবচেয়ে হতাশাজনক বাস্তবতা। কারণ বাজার শুধু ভালো খবরের পুরস্কার দেয় না; বাজার পুরস্কার দেয় প্রত্যাশার চেয়ে ভালো খবরকে।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

