পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি রয়েছে বলে খোলাখুলি স্বীকার করলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তবে তার স্পষ্ট বার্তা—এই আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে মুখের কথায় নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে।
সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে এক উন্মুক্ত আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি। তার ভাষায়, সূচক বা লেনদেনের পরিমাণ বাড়ানো নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ নয়—বরং একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল বাজার নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই বিএসইসির মূল দায়িত্ব।
আলোচনায় তিনি জানান, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা যথেষ্ট বেড়েছিল, কারণ বর্তমান সরকার পুঁজিবাজারবান্ধব একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যক্তি শ্রেণির শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশের ওপর চূড়ান্ত করহার ১৫ শতাংশে নির্ধারণ, যা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তুলনামূলক সুবিধাজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দীর্ঘদিনের অন্যতম সমস্যা ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের বিষয়েও কথা বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার দ্বিতীয় দিনেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি, বিশেষত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য যা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তিনি জানান, ফ্লোর প্রাইসের কারণে আন্তর্জাতিক একটি সূচক থেকে বাংলাদেশ বাদ পড়েছিল, তবে আগামী নভেম্বর থেকে সেই সূচকে পুনরায় অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত হয়েছে—যা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় অগ্রগতি বলে মনে করছেন তিনি।
একটি ওষুধ কোম্পানির লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে জিডিআর তালিকাভুক্তির দীর্ঘদিনের জটিলতাও সমাধান হয়েছে বলে জানান মাসুদ খান। কমিশনে যোগ দেওয়ার এক মাসের মধ্যেই এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এটি সমাধান না হলে ভবিষ্যতে দেশের কোনো কোম্পানির বিদেশে জিডিআর তালিকাভুক্তির পথই বন্ধ হয়ে যেত।
ব্রোকারেজ হাউজগুলোর তদারকি প্রসঙ্গে তিনি জানান, শুধু জরিমানার মাধ্যমে বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতি মোকাবিলা সম্ভব নয়। এ জন্য ঝুঁকিভিত্তিক পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি এবং নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শনের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি নজরদারি ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করতে ডিএসইর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ চলছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। বন্ড লেনদেনের অন্যতম বাধা ছিল উচ্চ ফি, যা ইতিমধ্যে কমানো হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে একটি বেসরকারি ব্যাংক হাজার কোটি টাকার সামাজিক বন্ড বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে বলেও জানান তিনি।
আইপিও প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, একাধিক পর্যায়ে একই ধরনের নথি ও প্রশ্ন যাচাইয়ের কারণে সময় বেশি লাগছে। এই জটিলতা কমাতে নতুন আইপিও বিধিতে সম্প্রসারিত নিরীক্ষা পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমে কোম্পানির সম্পদ, দায় ও আর্থিক তথ্যের প্রকৃত চিত্র যাচাই করা সম্ভব হবে।
সরাসরি তালিকাভুক্তির নতুন প্রবিধানও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে বলে জানান তিনি। এই পদ্ধতিতে একটি কোম্পানি দীর্ঘ আইপিও প্রক্রিয়া ছাড়াই নির্দিষ্ট পরিমাণ শেয়ার ছেড়ে দ্রুত—মাত্র দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই—তালিকাভুক্ত হতে পারবে। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে এই পদ্ধতিতে বেশ কয়েকটি ভালো মানের কোম্পানি বাজারে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এ ছাড়া আইপিও এবং সরাসরি তালিকাভুক্তির সমন্বয়ে একটি হাইব্রিড পদ্ধতি চালুরও পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
আইনি ক্ষমতাবলে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট শ্রেণির কোম্পানিকে বাধ্যতামূলকভাবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগের কথাও জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। এ জন্য একটি পৃথক বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি ক্লিয়ারিং কোম্পানি কার্যকর করার বিষয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেন তিনি। এটি চালু হলে ব্রোকারদের মার্জিন ও আর্থিক ঘাটতি সংক্রান্ত বিষয়গুলো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আওতায় আসবে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি চলতি বছরের মধ্যেই টি প্লাস ওয়ান নিষ্পত্তি পদ্ধতি চালুর লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে চলছে বলেও জানান তিনি।
মূলধনী বাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিল সক্রিয় করার প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান মাসুদ খান, যা আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে কার্যকর হতে পারে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে একটি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
বাজারের সাম্প্রতিক পতন প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাজারের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করা বিএসইসির কাজ নয়—এটি সম্পূর্ণভাবে বাজারের নিজস্ব শক্তির ওপর নির্ভরশীল বিষয়। স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপে বাজারকে কৃত্রিমভাবে চাঙা করাকে টেকসই সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। সবশেষে বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কমিশনের কার্যক্রম মূল্যায়ন করে তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তবে নিজেদের বিনিয়োগ সুরক্ষার দায়িত্বও তাদেরই নিতে হবে।

