জ্বালানি সংকটের প্রভাব যখন দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সরাসরি দৃশ্যমান, তখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির বেশ কিছু প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত মাসে গড়ে প্রতিদিন দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। দিনের পাশাপাশি রাতেও বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল প্রকট। অথচ একই সময়ে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সর্বোচ্চ পাওয়া গেছে মাত্র ৬৫০ মেগাওয়াট। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিন হাজার ২৮৭ মেগাওয়াটের বেশি সম্ভাব্য উৎপাদনক্ষমতার ৩৭টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছিল। ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে—বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন বিবেচনা না করে নেওয়া সেই সিদ্ধান্ত কি বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে?
বিদ্যুৎ খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, দেশে শুধু উৎপাদনক্ষমতা থাকলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয় না। জ্বালানি সরবরাহ, প্রকল্প বাস্তবায়ন, গ্রিড সক্ষমতা, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কিংবা সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ধাক্কা লাগে।
এই বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারত। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন নেই। একবার প্রকল্প স্থাপিত হলে উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখা যায়। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস যত বৈচিত্র্যময় করা যায়, একটি নির্দিষ্ট জ্বালানির ওপর নির্ভরতার ঝুঁকিও তত কমে।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ বিভাগের একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পাইপলাইনে থাকা ৩৭টি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়। এসব প্রকল্পের ক্ষেত্রে দায়মুক্তির আইনের আওতায় অনুমোদন বা প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল—এমন যুক্তি দেখানো হয়েছিল। দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় এক মাসের মধ্যেই প্রকল্পগুলো বাতিলের সিদ্ধান্ত আসে।
বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা ছিল তিন হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ২৭টি ছিল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। তিনটি প্রকল্প ছিল বায়ুবিদ্যুৎভিত্তিক এবং একটি ছিল বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। প্রকল্পগুলোর এলওআই বা প্রাথমিক অনুমতিপত্র ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে দেওয়া হয়েছিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এসব প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য ছিল। অর্থাৎ প্রকল্পগুলো বাতিল না হলে চলতি সময়ের মধ্যেই বেশ কিছু কেন্দ্র উৎপাদনে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। প্রকল্পগুলোর কয়েকটির ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণের কাজও এগিয়ে চলছিল।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মোট সক্ষমতা ছিল দুই হাজার ৪০৪ মেগাওয়াট। এগুলোর বেশির ভাগ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল রংপুর, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগে। বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মধ্যে ফেনীর সোনাগাজীতে ৩০ মেগাওয়াট, সাতক্ষীরার আশাশুনিতে ১০০ মেগাওয়াট এবং কক্সবাজারের চকরিয়ায় ২২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল।
এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বর্জ্য থেকে ১১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্পও ছিল। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সুযোগ ছিল।
শুধু অনুমোদনের পর্যায়ে থাকা প্রকল্পই নয়, সরকারি কয়েকটি প্রকল্পও তখন দরপত্র মূল্যায়নের পর্যায়ে ছিল। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াট, বড়পুকুরিয়ায় ২০ মেগাওয়াট এবং রাঙ্গুনিয়ায় ৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার তিনটি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন চলছিল। মহেশখালীতে যৌথ উদ্যোগে ১৬০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্রও মূল্যায়নাধীন ছিল।
বেসরকারি খাতেও কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে উদ্যোগ ছিল। কক্সবাজারের ইনানী ও চাঁদপুরে ৫০ মেগাওয়াট করে দুটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। পরে সেগুলো বাতিল করা হয় এবং পুনরায় দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়ায় থাকা অবস্থায় প্রকল্পগুলোর অনুমোদনও বাতিল করা হয়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, একটি প্রকল্পের সঙ্গে অনিয়ম বা রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ থাকলে পুরো প্রকল্প বাতিল করাই কি একমাত্র সমাধান? নাকি প্রকল্পগুলো পৃথকভাবে যাচাই করে যেগুলো অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে কার্যকর, সেগুলোকে নতুন নিয়মের আওতায় চালু করার সুযোগ দেওয়া যেত?
কারণ একটি প্রকল্প বাতিল করার অর্থ শুধু একটি কাগজের অনুমোদন বাতিল করা নয়। এর সঙ্গে বিনিয়োগ, জমি, অর্থায়ন, সরঞ্জাম কেনা, কর্মসংস্থান, স্থানীয় উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনাও জড়িয়ে থাকে।
বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১৫টি কোম্পানি ইতোমধ্যে জমি কিনেছিল এবং সরকারকে করও দিয়েছিল। বিভিন্ন পর্যায়ে এসব প্রকল্পে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়ে গিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্তের ফলে শুধু ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, ইতোমধ্যে বিনিয়োগ করা অর্থেরও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আরও বড় বিষয় হলো, এসব প্রকল্পে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ছিল। মোট ১৪টি দেশের অর্থায়নের সঙ্গে প্রকল্পগুলোর সম্পর্ক ছিল। এর মধ্যে চীনের চারটি, সিঙ্গাপুরের সাতটি এবং ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি করে প্রকল্প ছিল।
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি প্রকল্প বাতিলের প্রভাব সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিনিয়োগকারীরা একটি দেশের নীতি ধারাবাহিকতা, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং চুক্তির নিরাপত্তাও বিবেচনা করেন। তাই একটি প্রকল্প বাতিলের পর ভবিষ্যতে নতুন বিনিয়োগকারীরা একই ধরনের প্রকল্পে অর্থ দিতে কতটা আগ্রহী হবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এখানে আবার সামনে আসে সভরেন গ্যারান্টির বিষয়টি। বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্রে বিনিয়োগকারীদের কম আগ্রহের অন্যতম কারণ ছিল সরকারের পক্ষ থেকে সভরেন গ্যারান্টি না থাকা। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই ধরনের সরকারি নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
অন্তর্বর্তী সরকার পাঁচ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার নতুন গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল। কিন্তু সেখানে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। মাত্র ১১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দরপত্র জমা পড়ে। এসব প্রস্তাবের মোট সক্ষমতা ছিল প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ পাঁচ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াটের জন্য দরপত্র আহ্বান করেও প্রস্তাব এসেছে তার তুলনায় অনেক কম সক্ষমতার প্রকল্পের জন্য। এই ব্যবধান থেকেই বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের একটি ধারণা পাওয়া যায়।
বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের জন্য শুধু জমি বা বাজার থাকলেই হয় না। দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের আস্থা—সবগুলো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকি কমাতে চান।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, একই সময়ে পুরোনো প্রকল্প বাতিল এবং নতুন প্রকল্পের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলেও নতুন দরপত্রে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ পাওয়া যায়নি। ফলে একটি সম্ভাব্য উৎপাদন সক্ষমতা হারানোর পর তার বিকল্প তৈরি করাও দ্রুত সম্ভব হয়নি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ৩৭টি প্রকল্পের সবগুলোই দায়মুক্তির আইনের অধীনে প্রক্রিয়াধীন ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, একই আইনের আওতায় থাকা অন্য কিছু বিদ্যুৎ প্রকল্পকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একই ধরনের আইনি কাঠামোর ক্ষেত্রে ভিন্ন সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো।
এই অসামঞ্জস্যের কারণ পরিষ্কার না হলে বিদ্যুৎ খাতে নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। বিনিয়োগকারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো—আজ যে নীতি কার্যকর, কয়েক বছর পরও সেটি কতটা স্থিতিশীল থাকবে।
বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সৌর বা বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র পরিকল্পনা থেকে উৎপাদনে যেতে কয়েক বছর সময় লাগে। বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। জমি প্রস্তুত করতে হয়। সরঞ্জাম আমদানি করতে হয়। অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হয়। গ্রিড সংযোগের ব্যবস্থা করতে হয়। ফলে মাঝপথে নীতির পরিবর্তন হলে প্রকল্পের অর্থনৈতিক হিসাবই বদলে যেতে পারে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংকটের সময় নবায়নযোগ্য উৎস থেকে জাতীয় গ্রিডে সর্বোচ্চ ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাওয়ার তথ্যও বর্তমান পরিস্থিতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে। দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সক্ষমতা এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যাতে প্রচলিত জ্বালানির সংকট দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।
এই কারণেই নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকে শুধু পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। গ্যাসের ঘাটতি, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কিংবা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার সময়ে দেশীয় সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও বাস্তব চ্যালেঞ্জ আছে। সৌরবিদ্যুৎ দিনের আলো নির্ভর। বায়ুবিদ্যুৎও আবহাওয়া ও স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়। ফলে শুধু উৎপাদনক্ষমতা বাড়ালেই হবে না; গ্রিড আধুনিকীকরণ, শক্তি সঞ্চয়ের ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোও উন্নত করতে হবে।
এ কারণে আগের প্রকল্পগুলো বাতিল বা নতুন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোন এলাকায় কত সৌরবিদ্যুৎ প্রয়োজন, কোথায় বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনা বেশি, কোন প্রকল্প দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারে এবং কোন প্রকল্পের অর্থনৈতিক ব্যয় কম—এসব প্রশ্নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগও বাতিল হওয়া নবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, প্রকল্পগুলো নতুন করে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চীনের বিদেশি বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও অগ্রগতির পথ নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, রাজনৈতিক বিবেচনা ও অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আগের সরকারের সময়ে নেওয়া তিন হাজার ২৮৭ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার ৩৭টি প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে।
এখন মূল বিষয় হলো—এসব প্রকল্পের মধ্যে কোনগুলোতে অনিয়ম ছিল এবং কোনগুলো কেবল পূর্ববর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে বাতিল হয়েছে, তা আলাদাভাবে যাচাই করা। যদি প্রকল্পভেদে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করা না হয়, তাহলে ভালো ও খারাপ প্রকল্পকে একই পাল্লায় মাপার ঝুঁকি থাকে।
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের প্রতিটি প্রকল্পের ভাগ্য বদলে গেলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন এমন একটি খাত, যেখানে আজকের সিদ্ধান্তের ফল কয়েক বছর পর পাওয়া যায়। তাই রাজনৈতিক মেয়াদের চেয়ে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হয়।
বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটও দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু তাৎক্ষণিক উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদনক্ষমতা, নবায়নযোগ্য উৎস, গ্রিড অবকাঠামো এবং বিনিয়োগ—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
নতুন সরকার ইতোমধ্যে গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য আবার দরপত্র আহ্বান করেছে। কিন্তু আগের অভিজ্ঞতার পর নতুন বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই হবে বড় পরীক্ষা। তাদের বোঝাতে হবে যে প্রকল্প অনুমোদন হলে সেটি হঠাৎ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না এবং সরকারের সঙ্গে চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে নীতিগত ধারাবাহিকতা থাকবে।
বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন। দেশের চাহিদা বাড়ছে। শিল্পায়ন ও নগরায়নের সঙ্গে বিদ্যুতের প্রয়োজনও বাড়বে। এই চাহিদা পূরণে যদি সবসময় নতুন করে প্রকল্প পরিকল্পনা ও দরপত্র আহ্বান করতে হয়, তাহলে সময়ের ব্যবধান তৈরি হবে। সেই ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে আবার জরুরি ভিত্তিতে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজন হতে পারে।
তাই যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের উপযোগী এবং যেগুলোতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ইতোমধ্যে হয়েছে, সেগুলোকে নতুন করে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। দুর্নীতি বা অনিয়মের প্রমাণ থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে প্রয়োজনীয় হলে কেবল পূর্ববর্তী অনুমোদনের কারণে সেটি বাতিল করার পরিবর্তে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন শর্তে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগও বিবেচনা করা যেতে পারে।
এতে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা দ্রুত বাড়বে, অন্যদিকে ইতোমধ্যে বিনিয়োগ করা অর্থের অপচয়ও কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও একটি বার্তা যাবে—বাংলাদেশে সরকারের পরিবর্তন হলেও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর প্রকল্পের নীতি ও চুক্তিগত নিরাপত্তা বজায় থাকে।
বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান শুধু আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়। কোন ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র কোথায় হবে, কী জ্বালানি ব্যবহার করবে, উৎপাদন ব্যয় কত, পরিবেশগত প্রভাব কী, গ্রিড কতটা সক্ষম এবং ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ কতটা নিশ্চিত—এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বিশেষ করে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি কমাতে নবায়নযোগ্য উৎসের ওপর গুরুত্ব বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। সৌর, বায়ু ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করে বসে থাকলে হবে না; প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ বিদ্যুৎ খাতে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য শুধু বিদ্যুৎ বিভাগের বাজেট দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি কারখানায় বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন কমে। ব্যবসার খরচ বাড়ে। কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়ে। কৃষি ও সেচ ব্যাহত হতে পারে। ছোট ব্যবসায়ীদের ব্যয় বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পৌঁছে যায়।
গত মাসের দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটের লোডশেডিং তাই কেবল বিদ্যুৎ ঘাটতির পরিসংখ্যান নয়; এটি অর্থনীতির জন্য একটি সতর্ক সংকেত। সেই সংকেতকে গুরুত্ব দিয়ে এখন বিদ্যুৎ খাতের নীতিতে স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি।
নতুন পে-স্কেল বা অন্যান্য সরকারি ব্যয়ের মতো বিদ্যুৎ খাতেও রাষ্ট্রকে প্রতিটি সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাব বিবেচনা করতে হবে। তবে বিদ্যুৎ এমন একটি অবকাঠামোগত খাত, যেখানে ভুলের প্রভাব আরও বিস্তৃত। একটি প্রকল্প বাতিল করা সহজ, কিন্তু তার পরিবর্তে নতুন প্রকল্প এনে উৎপাদনে নেওয়া সময়সাপেক্ষ।
তাই অতীতের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর প্রকৃত অবস্থা যাচাই, বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ এবং গ্রিড অবকাঠামোর উন্নয়ন—এই চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতের নীতি যদি বারবার পরিবর্তিত হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীর আস্থা নষ্ট হবে। আর আস্থা নষ্ট হলে শুধু একটি প্রকল্প নয়, পুরো খাতের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বর্তমান সংকটের শিক্ষা তাই পরিষ্কার—বিদ্যুৎ খাতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে অর্থনৈতিক প্রয়োজন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে সামনে রেখে। যে প্রকল্পে অনিয়ম আছে, সেটি অবশ্যই তদন্তের আওতায় আসবে। কিন্তু কার্যকর ও প্রয়োজনীয় প্রকল্পকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনর্মূল্যায়ন করে এগিয়ে নেওয়ার পথ খোলা রাখা দরকার।
কারণ বিদ্যুতের ঘাটতি হলে তার অন্ধকার শুধু ঘরেই নামে না; ধীরে ধীরে তা শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও পুরো অর্থনীতির ওপর ছড়িয়ে পড়ে। সেই অন্ধকার ঠেকাতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধারাবাহিক, বাস্তবভিত্তিক এবং ভবিষ্যতমুখী বিদ্যুৎ নীতি।

