গতানুগতিক লোকাস স্ট্যান্ডির মানে হচ্ছে একজন মানুষ বা এন্টিটির কোর্টের সামনে দাড়ানোর রাইট আছে কিনা তা যাচাই করা। লোকাস স্ট্যান্ডি (Locus Standi) তত্ত্ব নির্ধারণ করে কে আদালতের কাছে সাংবিধানিক প্রতিকার চাইতে পারবেন। বাংলাদেশে জনস্বার্থ মামলা (Public Interest Litigation বা PIL)-এর ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ ধরনের মামলায় আবেদনকারী প্রায়ই সংশ্লিষ্ট অন্যায়ের প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী হন না।
সংবিধানের ৪৪ ও ১০২ অনুচ্ছেদ মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের সাংবিধানিক কাঠামো নির্ধারণ করলেও, জনস্বার্থ মামলার প্রেক্ষাপটে “সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি” (any person aggrieved) বলতে কী বোঝায়, তার কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা সেখানে দেওয়া হয়নি। আদালতকে অহেতুক হস্তক্ষেপকারীদের থেকে মুক্ত রাখতে এবং বিচারিক প্রতিকারকে সুনির্দিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যকার প্রকৃত বিরোধে সীমাবদ্ধ রাখতে লোকাস স্ট্যান্ডি তৈরি করা হয়েছিল।
তাত্ত্বিক জটিলতা
এখানেই মূল প্রশ্নটি তৈরি হয়। সংবিধানের ভাষা দেখে প্রথমে মনে হতে পারে, আদালতে যাওয়ার অধিকার কেবল সেই ব্যক্তিরই, যিনি সরাসরি কোনো ক্ষতির শিকার হয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় এতটা সহজ নয়। অনেক সময় কোনো সাংবিধানিক লঙ্ঘনের প্রভাব পড়ে বড় একটি জনগোষ্ঠীর ওপর, বিশেষ করে দরিদ্র, প্রান্তিক বা অসহায় মানুষের ওপর। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, অজ্ঞতা, সামাজিক বঞ্চনা কিংবা নানা বাস্তব সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের পক্ষে নিজেরা আদালতের দ্বারস্থ হওয়া প্রায়ই সম্ভব হয় না।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই বাংলাদেশে জনস্বার্থ মামলার (Public Interest Litigation) ধারণা ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে। ব্যক্তিগত ক্ষতির (personal injury) সংকীর্ণ ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, বিচার বিভাগ এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে, যেখানে বৃহত্তর জনস্বার্থ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কেস স্টাডি
কাজী মুখলেসুর রহমান বনাম বাংলাদেশ (১৯৭৪)
কাজী মুখলেসুর রহমান বনাম বাংলাদেশ, ২৬ ডিএলআর (এডি) ৪৪ (১৯৭৪) মামলায়, যা সাধারণত বেরুবাড়ি মামলা নামে পরিচিত। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৭৪ সালের দিল্লি চুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, যা দক্ষিণ বেরুবাড়ি ইউনিয়ন এবং সংলগ্ন ছিটমহল সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত ছিল। এইখানে আবেদনকারী প্রচলিত ব্যক্তিগত আইনের অর্থে সরাসরি কোনো ব্যক্তিগত ক্ষতির শিকার ছিলেন না। আবেদনকারীকে মামলা দায়েরের অধিকার প্রদান করে; আদালত মেনে নেয় যে সাংবিধানিক প্রশ্নটির গুরুত্ব ও জনস্বার্থমূলক চরিত্র প্রথাগত মানদণ্ড শিথিল করাকে যুক্তিসঙ্গত করে তোলে। এই রায়কে বাংলাদেশে সাংবিধানিক লোকাস স্ট্যান্ডির উদারতর ব্যাখ্যার কেইস হিসেবে গণ্য করা হয়।
ড. মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ (১৯৯৭) — FAP-20 মামলা
মামলাটি দায়ের হয় Flood Action Plan (FAP-20) প্রকল্পের বিরুদ্ধে, যা অভিযোগ অনুযায়ী বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন, জীবিকা ও পরিবেশের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছিল। প্রকল্পটি টাঙ্গাইল সদর, দেলদুয়ার ও বাসাইলে একটি কম্পার্টমেন্টালাইজেশন পাইলট প্রকল্প প্রায় ৩ লক্ষ মানুষকে সরাসরি বাস্তুচ্যুত এবং ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষের জীবিকা ও পরিবেশের ক্ষতি করার আশঙ্কা তৈরি করেছিল। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (BELA)-র তৎকালীন মহাসচিব ড. মহিউদ্দিন ফারুক ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে একটি রিট আবেদন দাখিল করেন, যথাযথ পরিবেশগত মূল্যায়ন বা জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়াই প্রকল্পটির বাস্তবায়নকে চ্যালেঞ্জ করে। হাইকোর্ট বিভাগ প্রাথমিকভাবে লোকাস স্ট্যান্ডাই-এর অভাবের কারণে আবেদন গ্রহন না করলেও পরে আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।
প্রধান বিচারপতি মুস্তফা কামাল বলেন, BELA, একটি পরিবেশ-বিষয়ক সংগঠন হিসেবে, “ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি” যোগ্যতা অর্জন করে কারন সংগঠনটি একটি অনির্ধারিত সংখ্যক মানুষের জনস্বার্থমূলক বিষয় সংক্রান্ত সৎ উদ্দেশ্যে ও কোনো অসৎ লক্ষ্য ছাড়াই কাজ করেছিল। আদালত আরো বলেন সৎ উদ্দেশ্যে এবং ব্যক্তিগত লাভ, ব্যক্তিগত মুনাফা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়া কাজ করেন, তবে তাকে “পর্যাপ্ত স্বার্থ” সম্পন্ন বলে গণ্য করতে হবে, এবং সেক্ষেত্রে তার হাইকোর্ট বিভাগে যাওয়ার লোকাস স্ট্যান্ডাই রয়েছে।
তুলনামূলক পর্যালোচনা: বাংলাদেশ ও ভারত
উভয় দেশের সংবিধানই প্রাথমিক রিট প্রতিকারকে একজন ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, যেমন- ভারতে ৩২ অনুচ্ছেদ এবং বাংলাদেশে ১০২ অনুচ্ছেদ এবং উভয় বিচার বিভাগই সাংবিধানিক সংশোধনীর পরিবর্তে ব্যাখ্যার মাধ্যমে এই শর্ত শিথিল করেছে। ভারতে, এই পরিবর্তন মূলত দরিদ্র ও অপ্রতিনিধিত্বপ্রাপ্ত মানুষদের প্রতি উদ্বেগ থেকে চালিত হয়েছিল, যেমনটি এস.পি. গুপ্ত মামলায় (S.P. Gupta v. Union of India, AIR 1982 SC 149) এবং PUDR মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে প্রতিফলিত হয়েছে যে অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার কার্যত অলীক। বাংলাদেশে, বিপরীতে, উদাহরন দেখা যায় কাজী মুখলেসুর রহমান কেসে যেখানে কোনো দারিদ্র্য-সম্পর্কিত অভিযোগ থেকে নয়, বরং একটি সার্বভৌমত্ব ও চুক্তি প্রণয়ন সংক্রান্ত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিরোধ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল।
বাংলাদেশের আদালতগুলো অবশ্য এখনো একটি জায়গায় স্বীকার করে না যে মামলা দায়েরের অধিকার কোনো স্থির, সংহিতাবদ্ধ নিয়মে বাঁধা পড়ে গেছে। বরং প্রতিটি মামলা এলে বিচারকরা নতুন করেই বিবেচনা করেন। অন্যদিকে, ভারতে এর বিপরীত ছবি। বছরের পর বছর মামলার মধ্য দিয়ে “ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি,” “যেকোনো ব্যক্তি,” আর “পর্যাপ্ত স্বার্থ”—এই ধারণাগুলোর একটা স্পষ্ট, নির্ভরযোগ্য কাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে।
জনস্বার্থ (PIL) মামলায় লোকাস স্ট্যান্ডাইয়ের অমীমাংসিত সীমা
তবে এত বছরের বিচারিক অগ্রযাত্রার পরও একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, যার উত্তর এখনো কেউ চূড়ান্তভাবে দিতে পারেননি। সংবিধান নিজে কোথাও বলে দেয়নি প্রতিনিধিত্বমূলক মামলা দায়েরের অধিকার ঠিক কতদূর বিস্তৃত হবে, কোনো এনজিও কখন ও কোন যুক্তিতে আদালতের দরজায় দাঁড়াতে পারবে, কিংবা “যথেষ্ট স্বার্থ” নামক যে পরীক্ষাটি আদালত নিজেই তৈরি করেছে তার সীমারেখা আসলে কোথায়।
এই পুরো কাঠামোটাই দাঁড়িয়ে আছে বিচারকদের ব্যাখ্যার ওপর। এটি একদিক থেকে নমনীয়তা দেয় ঠিকই, কিন্তু অন্যদিকে একজন বিচারপ্রার্থীর জন্য রেখে যায় অনিশ্চয়তা, আজ যে যুক্তিতে একটি সংগঠন মামলা দায়েরের অধিকার পেল, আগামীকাল অন্য এক বেঞ্চে সেই একই যুক্তি টিকবে কিনা তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না।
আর এই অনিশ্চয়তা আরও ঘন হয়ে ওঠে যখন প্রশ্নটি ওঠে অনাগরিকদের নিয়ে। সংবিধান নিজেই এখানে দুই রকম কথা বলে। ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থানরত প্রতিটি মানুষের জন্য প্রযোজ্য, তিনি নাগরিক হোন বা না হোন।
অথচ ৩৬ অনুচ্ছেদের চলাফেরার স্বাধীনতা সংরক্ষিত কেবল বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্যই। একই সংবিধানের ভেতরেই তাই দুটি ভিন্ন বৃত্ত আঁকা আছে, একটি সবার জন্য, আরেকটি শুধু নাগরিকদের জন্য।
ফল দাঁড়ায় এই যে, একজন শরণার্থী, রাষ্ট্রহীন মানুষ কিংবা অনথিভুক্ত অভিবাসীর পক্ষে কোনো সংগঠন বা ব্যক্তি আদালতে গিয়ে দাঁড়াতে পারবেন কিনা, এই প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর এখনো নেই। যতদিন এমন কোনো মামলা সরাসরি আদালতের সামনে না আসে, ততদিন এই প্রশ্ন একটি তাত্ত্বিক শূন্যতা হয়েই থেকে যাবে, এমন একটি ফাঁক, যেখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে অরক্ষিত মানুষদের একটি অংশ, শুধু নাগরিকত্বের অভাবেই, ন্যায়বিচার চাওয়ার পথ খুঁজে না-ও পেতে পারেন।
- জয়দীপ ঘোষ এলিন; লিগ্যাল রিসার্চার

