বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিনের মানবিক সংকট এখনও কাটেনি। বছরের পর বছর কেটে গেলেও তাদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের কোনো কার্যকর পথ তৈরি হয়নি। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর চাপ বহন করতে গিয়ে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীও নানাভাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এমন বাস্তবতায় নতুন করে মানবিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার।
সোমবার, ৩ আগস্ট, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয় দিয়ে আসা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ২ কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়। এই অর্থ ২০২৬ থেকে ২০২৮ মেয়াদের মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মাধ্যমে ব্যয় করা হবে।
ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব, শুল্ক ও বহুসংস্কৃতি বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিলের উপস্থিতিতে এই অর্থায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বার্তাও দেওয়া হয়েছে।
ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন এই অর্থায়ন শুধু জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি, দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো এবং নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সেবা চালিয়ে যেতে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থীদের চাপ বহন করে আসা স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীকেও এই কর্মসূচির আওতায় সহায়তা দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে জুলিয়ান হিল বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পাশে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গাদের স্থায়ী সমাধান একমাত্র তখনই সম্ভব, যখন মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসইভাবে ফিরে যাওয়ার মতো পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিনিধি জুলিয়েট মুরেকেয়িসোনি মনে করেন, প্রায় নয় বছর ধরে চলা এই সংকট ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না। অনেক দেশ ও দাতা সংস্থার মনোযোগ অন্য সংকটের দিকে চলে যাওয়ায় অর্থায়নের ঘাটতি বাড়ছে। এমন সময়ে অস্ট্রেলিয়ার এই নতুন সহায়তা শুধু আর্থিক অবদান নয়, আন্তর্জাতিক সংহতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল বলেন, নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে বিশেষ করে নারী, কন্যাশিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা আরও সহজ হবে। তাদের স্বাস্থ্য, সুরক্ষা এবং মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছেন। তাদের অধিকাংশই কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছেন এবং খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ঘাটতি। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের তুলনায় কম অর্থ আসায় অনেক মানবিক কর্মসূচি সীমিত করতে হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে শরণার্থীদের জীবনযাত্রার ওপর। খাদ্য সহায়তা থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই এই সংকট অনুভূত হচ্ছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। অর্থাৎ সংকট শুধু দীর্ঘস্থায়ীই হয়নি, বরং নতুন করে আরও মানুষ এতে যুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বের হওয়ার সময় প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন। এই তথ্য প্রমাণ করে, নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় এখনও বহু মানুষ জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খাদ্য বা চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময় ধরে শরণার্থী শিবিরে বসবাস করা মানুষদের জন্য শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
তাদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক মানবিক সংকট। তাই এর সমাধানেও প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ। মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও গ্রহণ করতে হবে।
সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ২ কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলারের নতুন অর্থায়ন এমন এক সময়ে এলো, যখন রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিকভাবে অর্থসংকটের মুখে রয়েছে। এই সহায়তা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কিছুটা স্বস্তি এনে দিলেও সংশ্লিষ্টদের মতে, টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

