যে পৃথিবীতে আইনও বদলে যাচ্ছে
আইখেনসেয়ারের প্রথম সতর্কবার্তা ছিল নতুন প্রজন্মের আইনজীবীরা এমন এক পৃথিবীতে প্রবেশ করছেন, যা এক দশক আগের পৃথিবীর মতো নয়। অর্থনীতি, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি এবং আইন সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের গতি বেড়েছে। তিনি মার্কিন প্রশাসনিক আইনের ‘শেভরন’ নীতির উদাহরণ দেন। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক আইনের গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি হিসেবে বিবেচিত এই মতবাদ অনুযায়ী, আইনে কোনো বিধানের ব্যাখ্যা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলে আদালত অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার ব্যাখ্যাকে গুরুত্ব দিত। কিন্তু ২০২৪ সালের Loper Bright Enterprises v. Raimondo মামলায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট শেভরন নীতিকে বাতিল করে দেয়। আদালত স্পষ্ট করে যে, আইন অস্পষ্ট হলেই সরকারি সংস্থার ব্যাখ্যার প্রতি বিচারিকভাবে বাধ্যতামূলক আনুগত্য দেখানো যাবে না; আদালতকে নিজস্ব বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ আইনজীবীদের কাছে আজ যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত, পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও বিচারিক বাস্তবতায় সেটিও আগামী দিনে বদলে যেতে পারে।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যে আইখেনসেয়ারের কাছে আইনজীবীর কাজ শুধু পুরোনো আইনের ধারা খুঁজে বের করা নয়। বরং মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে এমন ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা, যার সবকিছু আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, আইনজীবীকে অনিশ্চয়তার মধ্যে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও আইনি বিশ্লেষণের উৎস হিসেবে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ নতুন পরিস্থিতি এলে ‘এই বিষয়ে তো কোনো পরিষ্কার নিয়ম নেই’ বলে থেমে যাওয়া নয়; বরং কোন আইন প্রযোজ্য, ক্ষমতার সীমা কোথায় এবং সম্ভাব্য আইনি পরিণতি কী সেগুলো খুঁজে বের করাই পেশার বড় দায়িত্ব।
আন্তর্জাতিক আইনই এখন বড় পরীক্ষার জায়গা
আইখেনসেয়ারের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে তাঁর উদ্বেগ। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক আইন কখনোই পুরোপুরি নিখুঁতভাবে মানা হয়নি। কিন্তু বর্তমান সময়ে সমস্যা আরও গভীর হয়েছে, কারণ শক্তিশালী কিছু রাষ্ট্র এমন কর্মকাণ্ড করছে বা করার হুমকি দিচ্ছে, যার বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বলপ্রয়োগ এবং যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেগুলো নিয়েই নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে।
এখানে আইখেনসেয়ারের যুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইন সব সময় কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছে না এটি এক বাস্তবতা। কিন্তু সেখান থেকে যদি বলা হয়, ‘আইন দিয়ে কিছুই হবে না’, তাহলে সমস্যাটি আরও বড় হয়ে যায়। কারণ তখন কোনো রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন ভেঙেছে কি না, কোনো সামরিক পদক্ষেপ বৈধ কি না, কিংবা একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা কোথায় এসব প্রশ্নই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। আর আইন নিয়ে বিতর্কই যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বল প্রয়োগব্যবস্থাও আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। আইখেনসেয়ারের যুক্তি হলো, আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা থাকলেও আইনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বন্ধ করা যাবে না।
রাজনীতি আইনকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু আইনকে মুছে দিতে পারে না
আইখেনসেয়ারের বক্তব্যের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো রাজনীতি ও আইনের সম্পর্ক। বাস্তবে কোনো আইন প্রয়োগ হবে কি না, রাষ্ট্র কতটা কঠোরভাবে সেটি প্রয়োগ করবে এসব ক্ষেত্রে রাজনীতির বড় প্রভাব থাকতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব আছে বলেই আইন অর্থহীন হয়ে যায় না। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, কোনো আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ভূমিকা রাখতে পারে; কিন্তু সেই কারণে আইনগত প্রশ্নটাই বাতিল হয়ে যায় না।
এই যুক্তির একটি বাস্তব উদাহরণও তিনি তুলে ধরেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে আইন আদৌ কিছু বলতে পারে কি না এ নিয়ে তাঁর এক সহকর্মী আইনবিদের সঙ্গে মতপার্থক্যের কথা জানান আইখেনসেয়ার। তাঁর অবস্থান ছিল, রাজনৈতিক বাস্তবতা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, সামরিক শক্তি ব্যবহারের মতো সিদ্ধান্তের আইনি সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। কারণ আইন অপ্রাসঙ্গিক বলে ধরে নিলে ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ নিজেই বন্ধ হয়ে যায়।
‘আইন অপ্রাসঙ্গিক’ বলা কেন বিপজ্জনক
আইখেনসেয়ারের সবচেয়ে শক্তিশালী সতর্কবার্তা সম্ভবত এখানেই। তিনি মনে করেন, আইন অপ্রাসঙ্গিক এমন ধারণা আইনকে দুর্বল করতে চাওয়া সমালোচকদেরই সুবিধা করে দেয়। কারণ আইনজীবীরাই যদি বলেন যে সবকিছু শেষ পর্যন্ত রাজনীতি, তাহলে আইনের মাধ্যমে ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের যুক্তিটিই দুর্বল হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে এর ফল আরও গুরুতর হতে পারে। কোনো কাজ বৈধ না অবৈধ এই বিতর্কই যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের সীমারেখা কোথায়, সেটিও অস্পষ্ট হয়ে পড়বে।
এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আদালত এবং যুদ্ধ ও বলপ্রয়োগ নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নীতি গড়ে ওঠার পেছনে ছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। এই ব্যবস্থা নিখুঁত নয়, তার প্রয়োগেও বড় সীমাবদ্ধতা আছে। তবু আইখেনসেয়ারের বক্তব্য হলো আইনহীন বিশ্বের তুলনায় একটি অসম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থাও বেশি নিরাপদ। তাঁর মতে, সেই কাঠামোকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা করা উচিত; হতাশ হয়ে সেটিকে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করা নয়।
আইনজীবীর কাজ শুধু আদালতে শেষ হয় না
আইখেনসেয়ার ভবিষ্যৎ আইনজীবীদের আরেকটি বিষয় মনে করিয়ে দিয়েছেন পেশাটি শুধু মামলা পরিচালনা বা আইনের ধারা ব্যাখ্যা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে আইনজীবীকে মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতেও সাহায্য করতে হবে। নতুন প্রযুক্তি, ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা কিংবা প্রশাসনিক নীতির পরিবর্তন সবকিছুরই আইনি প্রভাব থাকতে পারে। ফলে একজন আইনজীবীর দক্ষতা শুধু বইয়ে থাকা আইন জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; পরিবর্তিত বাস্তবতায় সেই আইন কীভাবে কাজ করবে, সেটিও বুঝতে হবে।
তবে শুধু কাজের চাপ বাড়িয়ে যাওয়ার পক্ষেও নন আইখেনসেয়ার। তাঁর বক্তৃতার দ্বিতীয় বড় বার্তা ছিল নিজের পেশাগত গতি নিয়ন্ত্রণ করা। পরিবার, বন্ধু, ব্যক্তিগত আগ্রহ ও বিশ্রামের জন্য সময় রাখা জরুরি কারণ দীর্ঘমেয়াদি ভালো কাজের জন্য মানসিক সক্ষমতা ধরে রাখা প্রয়োজন। একজন আইনজীবী সবসময় সর্বোচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক চাপের মধ্যে কাজ করতে পারেন না। এই ভারসাম্য না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে বার্নআউট তৈরি হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত পেশাগত দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মতপার্থক্য থাকবে, তবু ‘ভালো লড়াই’ চালিয়ে যেতে হবে
আইখেনসেয়ার শিক্ষার্থীদের আরও একটি বাস্তব কথা বলেছেন আইনের সব প্রশ্নের একটিমাত্র সহজ উত্তর থাকে না। একজন আইনজীবী এমন অবস্থান নিতে পারেন, যার বিপরীতে তাঁর সম্মানিত সহকর্মী দাঁড়াচ্ছেন। এতে আইনের মূল উদ্দেশ্য নষ্ট হয় না। বরং মতপার্থক্যকে নিয়মের মধ্যে রেখে বিতর্ক করার সুযোগ তৈরি করাই আইনের অন্যতম কাজ। তাই তিনি ভবিষ্যৎ আইনজীবীদের ‘ভালো লড়াইগুলো’ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই বক্তব্যের তাৎপর্য শুধু আইন পেশার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি কার্যকর আইনি ব্যবস্থায় ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানও আইনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে এটাই তার মূল শক্তি। আইন সব সময় ক্ষমতাকে থামাতে পারবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু ক্ষমতার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গাটি যদি পুরোপুরি হারিয়ে যায়, তাহলে জবাবদিহির ব্যবস্থাও দুর্বল হয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি আইন কতটা শক্তিশালী, সেটি নয়
আইখেনসেয়ারের বক্তৃতার সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত হলো আইনের প্রয়োজনীয়তা তার নিখুঁত প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে না। বরং আইন যখন সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তখনই তার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়। তিনি তাই নতুন আইনজীবীদের বলেছেন, বড় সংকট ও গুরুতর চ্যালেঞ্জের সময়ে তাঁদেরই হতে হবে আইন ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘সবার শেষে’।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেকোনো দেশের জন্য এই বার্তার একটি সাধারণ শিক্ষা আছে। আইন সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারে না। আদালতের রায় সব সময় বাস্তবে পুরোপুরি কার্যকর হয় না। রাজনৈতিক ক্ষমতাও অনেক সময় আইনের ওপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতার কারণে আইনকে অপ্রাসঙ্গিক বলে মেনে নেওয়া হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমগুলোর একটিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই ক্রিস্টেন আইখেনসেয়ারের শেষ বক্তৃতার সারকথা হয়তো খুব সহজ করে এভাবে বলা যায়, আইন ভাঙার ঘটনা যত বাড়বে, আইনজীবীর দায়িত্ব তত কমবে না; বরং তখনই তাঁকে আরও বেশি করে প্রশ্ন করতে হবে, কোন ক্ষমতা বৈধ, কোন সিদ্ধান্ত আইনসম্মত এবং কোথায় আইনের সীমা শেষ হচ্ছে। কারণ আইন সব সময় জয়ী হবে, এমন নিশ্চয়তা না থাকলেও, আইনকে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করে দেওয়া মানে সেই লড়াই শুরু হওয়ার আগেই ছেড়ে দেওয়া।
মিজান মাজনুন
আইনজীবী ও সাংবাদিক

