আপনি রাষ্ট্রের নাগরিক, রাষ্ট্রের দায়িত্ব আপনার মানবাধিকার নিশ্চিতের পাশাপাশি একজন নাগরিকের প্রতি তার সকল দায়িত্ব পালন করা। কিন্তু এই রাষ্ট্র যখন নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠে তার নাগরিকের উপর তখন সেই ভূখণ্ডে আইনের শাসন বলতে কিছু থাকে না।
রাষ্ট্র কর্তৃক গুম হচ্ছে সেই নিপীড়নের অংশ, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত গুম এমন একটি জঘন্য অপরাধ, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী হলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনি কাঠামোতে এখনো স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত নয়। এই অপরাধের বিশেষত্ব হলো, অপরাধী নিজেই রাষ্ট্র, ফলে রাষ্ট্রের অধীন তদন্ত সংস্থা পক্ষপাতমুক্ত তদন্ত নিশ্চিত করতে পারে না, যা স্বতন্ত্র তদন্ত কর্তৃপক্ষের অপরিহার্যতা প্রমাণ করে
গুম কি?
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, গুম বলতে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের অনুমোদনপ্রাপ্ত কোনো পক্ষের দ্বারা কোনো ব্যক্তিকে আটক, অপহরণ বা স্বাধীনতা হরণ করার পর সেই ব্যক্তির অবস্থান গোপন রাখা এবং তাকে আইনের সুরক্ষার বাইরে সরিয়ে রাখাকে বোঝায়। সাধারণ আটকপ্রক্রিয়ার সাথে গুমের মৌলিক পার্থক্য হলো এখানে রাষ্ট্র সুপরিকল্পিতভাবে আটকের সত্যতা অস্বীকার করে এবং ভুক্তভোগীকে বিচারিক প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ আওতার বাইরে রেখে নিখোঁজ করে দেয়।
আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো
গুম প্রতিরোধে প্রধান আন্তর্জাতিক দলিলগুলো রাষ্ট্রের ওপর সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। ২০০৬ সালের ICPPED (International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance) সবচেয়ে সমন্বিত কাঠামো প্রদান করে, যা ন্যায়বিচার, সত্য অনুসন্ধান এবং ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা দেয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বব্যাপী এই অপরাধকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং রাষ্ট্রসমূহকে এর পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য করা।
ICPPED-এর ১২ নং ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রকে অবশ্যই দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে: এমনকি কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না থাকলেও। এছাড়া, সনদটি গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার এবং তাদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির আইনি ভিত্তি সুদৃঢ় করার পাশাপাশি ‘কমিটি অন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস’-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রকে নিয়মিত জবাবদিহির আওতায় আনার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে
এছাড়া ১৯৯২ সালের UN Declaration, ১৯৯৪ সালের Inter-American Convention, এবং ১৯৯৮ সালের Rome Statute – এই তিনটি দলিলে গুমকে সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিচারিক নজির হিসেবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে গুম-সংক্রান্ত সবচেয়ে প্রভাবশালী রায় ঐতিহাসিক Velásquez-Rodríguez v. Honduras (1988) মামলা। এই রায়ে আদালত প্রতিষ্ঠা করে যে, রাষ্ট্রের দায় কেবল সরাসরি অপরাধ সংঘটনেই সীমাবদ্ধ নয়, গুমের ঘটনা তদন্তে ব্যর্থতা, দোষীদের চিহ্নিত না করা এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত না করাও একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় দায়। এই রায় স্পষ্ট করে দেয়—”তদন্ত কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে” তা নিজেই একটি আইনি দায়বদ্ধতার বিষয়, নিছক প্রশাসনিক পদ্ধতি নয়।
ঘটনাবলি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাংবাদিক ও কর্মীদের গুমের শিকার হওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে, যেখানে RAB ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সরাসরি সম্পৃক্তি রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আন্তর্জাতিক ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- সিরিয়ায় ২০১১ সালের মার্চ থেকে ২০১৯ সালের আগস্ট পর্যন্ত কমপক্ষে ১,৪৪,৮৮৯ জন ব্যক্তিকে গুম করা হয়েছে। (রেফারেন্স- SNHR- 2019). মেক্সিকোর গুয়েরেরো রাজ্যে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ৪৩ জন ছাত্র গুমের শিকার হওয়ার ঘটনাটি তদন্তের গুরুতর ত্রুটি প্রকাশ করে কারণ তদন্তের সাথে খোদ আসামি পক্ষই জড়িত।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের অকার্যকর ভূমিকা এবং প্রায়শই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের এই রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা মূলত দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেয়, যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার দীর্ঘদিনের দাবির সাথে সাংঘর্ষিক।
স্বতন্ত্র তদন্ত কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয়তা
ICPPED-এর ১২ নং ধারা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে গুমের তদন্ত অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে, কারণ অপরাধী স্বয়ং রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট—ফলে রাষ্ট্রের অধীন সংস্থা দ্বারা পক্ষপাতমুক্ত তদন্ত অসম্ভব।
UN Committee on Enforced Disappearances এবং Working Group on Enforced or Involuntary Disappearances (WGEID) যৌথভাবে স্বল্পমেয়াদী গুমের বিরুদ্ধে সতর্ক জারি করেছে, যেখানে রাষ্ট্রগুলো গোপনীয়তার আড়ালে স্বল্পমেয়াদী স্বাধীনতাচ্যুতিকে বৈধ বলে দাবি করে। মেক্সিকোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করলেও রাষ্ট্র যদি পরিসংখ্যান সংগ্রহ ও অনুসন্ধানে আন্তরিক না হয়, তবে ফলাফল নগণ্য থাকে।
বাংলাদেশের গুম কমিশনের অভিজ্ঞতা থেকেই এই প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে কয়েকটি কারণে:
১. অভিযুক্ত ও তদন্তকারী একই কাঠামোর অংশ হলে স্বার্থের সংঘাত অনিবার্য। যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই বাহিনীরই সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে তদন্ত পরিচালিত হলে প্রমাণ নষ্ট বা গোপন করার সুযোগ থেকে যায়, যেমনটি আয়নাঘর পরিদর্শনের সময় ঘটেছে বলে কমিশন নিজেই জানিয়েছে।
২. সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ ছাড়া ভুক্তভোগী পরিবারগুলো প্রতিহিংসার আশঙ্কায় অভিযোগ করতে দ্বিধাবোধ করে।
৩. সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তদন্তের গতি বা অভিমুখ পরিবর্তিত হওয়া উচিত নয়; একটি সাংবিধানিক বা আইনি ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ এই ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারে, যা সাময়িক কমিশন অব ইনকোয়ারি দিয়ে সম্ভব নয়। আইনি ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি।
৪. ICPPED-এর মূল চেতনাই হলো, তদন্ত কর্তৃপক্ষের কাঠামোগত স্বাধীনতা ছাড়া প্রকৃত জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ICPPED-এ পক্ষভুক্ত হয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা গ্রহণ করেছে। কিন্তু এই বাধ্যবাধকতা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে তার কোনো মূল্য নেই। Velásquez-Rodríguez নীতি থেকে শুরু করে ICPPED-এর অনুচ্ছেদ ১২, ICCPR-এর ইতিবাচক বাধ্যবাধকতা সব কিছু একদিকেই দিকে নির্দেশনা দেয় আর তা হলো – অভিযুক্ত রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন কাঠামো দিয়ে গুমের প্রকৃত তদন্ত সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে একটি সংসদীয় আইনের মাধ্যমে স্থায়ী, স্বাধীন তদন্ত কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও দেশীয় সাংবিধানিক অঙ্গীকার, উভয়ের প্রতি প্রকৃত অর্থে দায়বদ্ধ থাকার।
- জয়দীপ ঘোষ, লিগ্যাল রিসার্চার

