আপনার হাতে ১০০ টাকা। আপনি সেটি দিয়ে বাজার থেকে পণ্য কিনলেন। দোকানি সেই ১০০ টাকা দিয়ে আরেকজনের কাছ থেকে পণ্য কিনলেন, সেই ব্যক্তি আবার অন্য কাউকে টাকা দিলেন। কয়েক দফা হাতবদলের পর দেখা গেল, একই ১০০ টাকা দিয়ে মোট ৫০০ টাকার লেনদেন হয়েছে। তাহলে কি অর্থনীতিতে ৫০০ টাকা তৈরি হলো? না, এখানেই ‘মানি ভেলোসিটি’ আর ‘মানি মাল্টিপ্লায়ার’-এর পার্থক্য।
বিষয়টি সহজ করে ভাবুন। একটি অর্থনীতিতে থাকা প্রতিটি টাকা যদি বছরে একবারই হাতবদল করে, তাহলে সেই টাকার মাধ্যমে যতটুকু লেনদেন হবে, সেটি তুলনামূলক কম। কিন্তু একই টাকা যদি বছরে পাঁচবার, দশবার বা আরও বেশি বার পণ্য ও সেবা কেনাবেচায় ব্যবহার হয়, তাহলে অর্থনীতিতে মোট লেনদেনের মূল্য সেই টাকার মজুদের চেয়ে অনেক বড় হতে পারে। এটিই মানি ভেলোসিটি অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ে একটি টাকা গড়ে কতবার অর্থনৈতিক লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই ১০০ টাকা দিয়ে ৫০০ টাকার লেনদেন হওয়া মানে নতুন ৪০০ টাকা ছাপানো নয়; বরং একই টাকা দ্রুত ঘুরে বেড়িয়েছে।
এখানে একটি মজার ব্যাপার আছে। টাকা কতবার হাতবদল করছে আর ব্যাংকিং ব্যবস্থা কতটা নতুন আমানত ও ঋণ তৈরি করতে পারছে দুটি কিন্তু এক বিষয় নয়। দ্বিতীয় ঘটনাটিই মূলত মানি মাল্টিপ্লায়ার দিয়ে বোঝানো হয়। ধরুন, একজন ব্যক্তি ব্যাংকে ১০০ টাকা জমা দিলেন। ব্যাংক সেই অর্থের একটি অংশ তারল্য বা রিজার্ভ হিসেবে রেখে বাকি অংশ ঋণ হিসেবে দিতে পারে। সেই ঋণের টাকা আবার অন্য কারও ব্যাংক হিসাবে জমা পড়তে পারে, সেখান থেকে আবার ঋণ তৈরি হতে পারে। ফলে প্রাথমিক আমানতের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানতের পরিমাণ বাড়তে পারে। অর্থাৎ এখানে বিষয়টি শুধু টাকা হাতবদল নয়, ব্যাংক আমানত ও ঋণ সৃষ্টির প্রক্রিয়া।
তবে বাস্তব অর্থনীতিতে বিষয়টি পাঠ্যবইয়ের সরল হিসাবের মতো কাজ করে না। ব্যাংক প্রতিটি জমার পুরো অবশিষ্ট অংশ ঋণ দিতে পারে না, ঋণের চাহিদা থাকতে হয়, ব্যাংককে ঝুঁকি বিবেচনা করতে হয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ‘১০০ টাকা জমা দিলেই ৫০০ টাকা তৈরি’ এমন সরল নিয়ম বাস্তবে প্রযোজ্য নয়। বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত, ঋণ, রিজার্ভ, সুদের হার এবং মানুষের অর্থ ধরে রাখার প্রবণতা, সব মিলেই অর্থের বিস্তার নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক তথ্য দেখলেও বিষয়টির গুরুত্ব বোঝা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, মে ২০২৬ শেষে দেশের ব্রড মানি বা এম২ ছিল প্রায় ২৩৯.১১ লাখ কোটি টাকা, যা এক বছর আগের তুলনায় ১২.৪৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আমানত ছিল প্রায় ২০৩.২৬ লাখ কোটি টাকা এবং ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ ছিল প্রায় ২৯.৬৩ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থনীতিতে ‘টাকা’ বলতে শুধু মানুষের হাতে থাকা নোট নয়; ব্যাংক হিসাবে থাকা আমানতও অর্থের একটি বড় অংশ।
এবার আসি মানি ভেলোসিটি-তে। অর্থনীতির মোট উৎপাদন বা আয়ের তুলনায় অর্থের মজুদ কত দ্রুত ঘুরছে, তার একটি ধারণা দেয় এই সূচক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে ব্রড মানি ভেলোসিটি প্রায় ২-এর কাছাকাছি ধরা হয়েছে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট সময়ে অর্থের মজুদের প্রতিটি একক গড়ে প্রায় দুই ইউনিটের সমপরিমাণ চূড়ান্ত অর্থনৈতিক লেনদেনকে সমর্থন করছে যদিও হিসাবের পদ্ধতি ও সময়সীমার ওপর ফল বদলাতে পারে। একই মূল্যায়নে বাংলাদেশের ব্রড মানি মাল্টিপ্লায়ারও প্রায় ৫.৭ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই দুই সংখ্যাকে পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যায় মাল্টিপ্লায়ার বলছে অর্থব্যবস্থার ভেতরে আমানত ও ঋণের মাধ্যমে অর্থের পরিমাণ কীভাবে বিস্তৃত হচ্ছে, আর ভেলোসিটি বলছে সেই অর্থ কত দ্রুত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ঘুরছে।
এখানেই বিষয়টি সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন, ব্যাংকে টাকা জমা থাকল কিন্তু ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছেন না, মানুষও খরচ না করে টাকা ধরে রাখছে। তাহলে অর্থনীতিতে টাকার পরিমাণ খুব বেশি কমে না গেলেও ভেলোসিটি কমে যেতে পারে। বিপরীতে মানুষের আয়, ব্যবসায়িক লেনদেন ও বিনিয়োগ বাড়লে একই অর্থ দ্রুত হাতবদল করতে পারে। তাই শুধু ‘অর্থনীতিতে কত টাকা আছে’ দেখলেই অর্থনীতির গতি বোঝা যায় না; সেই টাকা কত দ্রুত চলছে, কোথায় যাচ্ছে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কতটা ঋণ ও আমানত তৈরি হচ্ছে—সেটিও দেখতে হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক কঠোর মুদ্রানীতি ধরে রাখছে, অন্যদিকে দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক অর্থায়নের চাপও সামলাতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ শেষে ব্রড মানি প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৪৩ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৭২ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থের মোট সরবরাহ বাড়লেও ঋণপ্রবাহের গতি তুলনামূলক দুর্বল ছিল।
তাই শুরুতে ফিরে আসি, একই ১০০ টাকা দিয়ে ৫০০ টাকার লেনদেন কীভাবে সম্ভব? কারণ টাকা শুধু পড়ে থাকে না, অর্থনীতির ভেতরে ঘোরে। সেই ঘোরার গতি হলো মানি ভেলোসিটি। আর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত ও ঋণ সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থের পরিমাণ যে প্রক্রিয়ায় বিস্তৃত হতে পারে, সেটি মানি মাল্টিপ্লায়ারের বিষয়। দুটিকে এক করে ফেললে মনে হতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১০০ টাকা ছাপালেই অর্থনীতিতে ৫০০ টাকা তৈরি হয়ে যায়। বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয়, অর্থনীতির শক্তি শুধু কত টাকা আছে, তার ওপর নয়; সেই টাকা কতবার ঘুরছে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা তাকে কতটা উৎপাদনশীল কাজে পাঠাতে পারছে, তার ওপরও নির্ভর করে।

