যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কিছুটা চাপে পড়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে দেশটি বাংলাদেশ থেকে ৪০১ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ কম।
যুক্তরাষ্ট্রের বস্ত্র ও পোশাকবিষয়ক দপ্তরের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস এ হিসাব জানিয়েছে।
তবে ছয় মাসের সামগ্রিক চিত্রে পতন থাকলেও জুন মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে আশার আলো দেখা গেছে। ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৭৬ কোটি ৩৫ লাখ ৭০ হাজার ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের জুনের তুলনায় এবার একই মাসে আমদানির পরিমাণ বেড়েছে ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির এই পতনকে শুধু দেশের নিজস্ব পরিস্থিতি দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। কারণ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানির বাজারও সংকুচিত হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশটির মোট পোশাক আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মূল্যের হিসাবে ৮ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং পরিমাণের হিসাবে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ কমেছে।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমেছে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার চেয়েও বেশি হারে। সেই দিক থেকে দেখলে বাংলাদেশের ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ পতন তুলনামূলকভাবে কম। তবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অন্য কয়েকটি দেশ একই সময়ে রপ্তানি বাড়াতে সক্ষম হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি নতুন করে ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কম্বোডিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি মূল্যের হিসাবে ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়েছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে বেড়েছে ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম থেকে ১ দশমিক ০৮ শতাংশ।
অন্যদিকে পাকিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই পতন ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তবে বড় সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও চীনের পরিস্থিতি আরও দুর্বল। একই সময়ে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে ২৫ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং চীন থেকে কমেছে ৩৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
পরিমাণের দিক থেকেও বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে, তবে পতনের হার তুলনামূলকভাবে সীমিত। প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির পরিমাণ কমেছে ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। বিপরীতে কম্বোডিয়া থেকে আমদানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া থেকে ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম থেকে ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। পাকিস্তান থেকেও আমদানির পরিমাণ বেড়েছে ২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
ভারত ও চীনের ক্ষেত্রে পরিমাণের পতনও বেশ বড়। ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির পরিমাণ কমেছে ২২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। চীনের ক্ষেত্রে এই পতন ২৬ দশমিক ৩০ শতাংশ।
এদিকে পোশাকের গড় একক মূল্যেও পরিবর্তন দেখা গেছে। জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পোশাকের গড় একক মূল্য কমেছে ২ দশমিক ১৫ শতাংশ। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও কমেছে একই হারে। কম্বোডিয়ার পোশাকের গড় একক মূল্য কমেছে ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
ভারতের ক্ষেত্রে এই পতন ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ, পাকিস্তানের ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং চীনের ১৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেলের বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের রপ্তানি পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র উঠে এসেছে। তাঁর মতে, বছরের প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ঠিকই, তবে চীন ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের পতনের হার অনেক কম। বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটা পাকিস্তানের কাছাকাছি।
তবে প্রতিযোগিতার জায়গায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আসছে কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের দিক থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের বাজার যখন সামগ্রিকভাবে সংকুচিত হয়েছে, তখনও এসব দেশ রপ্তানি বাড়াতে পেরেছে। এর অর্থ হচ্ছে বাজার সংকোচনের পাশাপাশি ক্রেতাদের পছন্দ, মূল্য, সরবরাহ সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের বিষয়গুলোও বাংলাদেশের রপ্তানিতে প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। ফলে দেশটির বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু একটি ছয় মাসের পরিসংখ্যান নয়; এটি পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। বিশেষ করে একই বাজারে কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যখন প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারছে, তখন বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা জরুরি হয়ে উঠছে।
জুন মাসের ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অবশ্য কিছুটা স্বস্তির খবর দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই ইতিবাচক ধারা পরবর্তী মাসগুলোতেও বজায় থাকে কি না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমে যাওয়ার মধ্যেই বাংলাদেশের পোশাক খাতকে একদিকে বাজারের চাপ সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গেও লড়াই করতে হচ্ছে।

