এশিয়ার শীর্ষ ধনী থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড একজন মানুষের জীবনের উত্থান-পতনের চেয়েও বড় এই গল্প চীনের পুরো আবাসন খাতের সংকটের প্রতীক। চায়না এভারগ্র্যান্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা হুই কা ইয়ানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে চীনের একটি আদালত। আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) শেনজেন ইন্টারমিডিয়েট পিপলস কোর্ট এই রায় ঘোষণা করে। পাঁচ বছর আগে এভারগ্র্যান্ডের পতনে চীনের অর্থনীতি ও আর্থিক বাজার কেঁপে উঠেছিল; সেই ঘটনার পাঁচ বছর পর এল এই রায়।
আদালত জানিয়েছে, হুই কা ইয়ানের বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ ছিল তহবিলের অপব্যবহার, অর্থ সংগ্রহের নামে প্রতারণা, বেআইনিভাবে জনগণের আমানত গ্রহণ, বেআইনিভাবে ঋণদান, প্রতারণার আশ্রয়ে সিকিউরিটিজ ইস্যু এবং ঘুষ প্রদান। চলতি বছরের এপ্রিলে তিনি সব অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। আদালতের রায়ে তার সব ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি আজীবনের জন্য রাজনৈতিক অধিকার বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুধু হুই নন, এভারগ্র্যান্ড গ্রুপকে ৮৮২ কোটি ইউয়ান (প্রায় ১৩১ কোটি ডলার) এবং এর প্রধান সহযোগী প্রতিষ্ঠান হেংদা রিয়েল এস্টেটকে ৭০০ কোটি ইউয়ান জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির পাঁচ শীর্ষ কর্মকর্তাকে ৬ থেকে ১৮ বছর কারাদণ্ড এবং আরও ৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
হুই কা ইয়ানের জীবনটা ছিল এক রূপকথার গল্প। মধ্য চীনের হেনান প্রদেশের এক গ্রামে দাদির কাছে বেড়ে ওঠা এই সাবেক ইস্পাত টেকনিশিয়ান ১৯৯৬ সালে এভারগ্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেন। আগ্রাসীভাবে ঋণ নিয়ে তিনি এটিকে চীনের শীর্ষ আবাসন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে তার নিট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪৫৩ কোটি ডলার এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনে ছিল বিশাল ঋণের বোঝা, যা একদিন পুরো প্রতিষ্ঠানকেই ধসিয়ে দেয়।
২০২১ সালে এভারগ্র্যান্ড ৩০ হাজার কোটি ডলারের অধিকাংশ দায় পরিশোধে ব্যর্থ হয়। এর ফলে চীনের আবাসন খাতে যে সংকট শুরু হয়, তা আজও কাটেনি। ২০২৪ সালে হংকংয়ের এক আদালত এভারগ্র্যান্ডকে অবসায়নের (লিকুইডেশন) নির্দেশ দেয় এবং গত বছর হংকং স্টক এক্সচেঞ্জ এটিকে তালিকাচ্যুত করে।
আদালতের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এভারগ্র্যান্ড গ্রুপ, হেংদা রিয়েল এস্টেট এবং হুই কা ইয়ানের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিপুল অঙ্কের অর্থ ও চরম গুরুতর অনিয়ম জড়িত ছিল। এর ফলে গুরুতর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি হয়েছে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভারগ্র্যান্ডের কাছ থেকে বাড়ি কেনা মানুষজন নানা মন্তব্য করেছেন। একজন লিখেছেন, ‘সব সাধারণ নাগরিককেই মাশুল দিতে হয়েছে।’ আরেকজন বলেছেন, ‘কারাদণ্ড মূলত তাঁকে রক্ষা করার জন্য। তিনি বাইরে এলে তাঁর জীবন ঝুঁকিতে পড়বে।’
অবসায়ন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। গত বছর আগস্ট পর্যন্ত পাওনাদারদের ৪৫০০ কোটি ডলারের দাবির বিপরীতে মাত্র ২৫৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে। চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে অবসায়নকারীরা হুই ও তার সাবেক স্ত্রীর অফশোর সম্পদ জব্দ করার জন্য আদালতে লড়াই করছেন, যাতে প্রতিষ্ঠাতা ও অন্যান্য সাবেক কর্মকর্তার পরিশোধ করা ৬০০ কোটি ডলারের লভ্যাংশ ও বেতন উদ্ধার করা যায়।
হুই কা ইয়ানের এই রায় শুধু একজন ব্যবসায়ীর শাস্তি নয় এটি চীনের আবাসন খাতের সংকটের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। কিন্তু যে ৩০ হাজার কোটি ডলারের ঋণ ও লক্ষাধিক সাধারণ বিনিয়োগকারীর হারানো সঞ্চয় রয়েছে, তাদের জন্য এই রায় হয়তো তেমন কিছু বদলাবে না। সাধারণ মানুষ এখনও প্রশ্ন তুলছেন ‘আমাদের অর্থের কী হবে?’

