কার্বন নিঃসরণ কমানোর কথা বললে আমরা সাধারণত দেশগুলোর দিকে তাকাই। কে কত কার্বন ছাড়ছে, কোন দেশ কয়লা কমাবে, কে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাচ্ছে এসবই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। কিন্তু প্রশ্নটা যদি একটু অন্যভাবে করা হয়? বিশ্বের অর্ধেকের বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি ও সিমেন্ট-সম্পর্কিত কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ যদি মাত্র ৩২টি কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে জলবায়ু সংকটের দায় শুধু রাষ্ট্রের হিসাবেই দেখলে কি পুরো ছবিটা ধরা পড়ে?
কার্বন মেজরস ডেটাবেজের ২০২৪ সালের তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বড় তেল, গ্যাস, কয়লা ও সিমেন্ট উৎপাদকদের মধ্যে মাত্র ৩২টি কোম্পানির উৎপাদন ও বাজারজাত পণ্যের সঙ্গে ২০২৪ সালের বৈশ্বিক জীবাশ্ম জ্বালানি ও সিমেন্ট খাতের অর্ধেকের বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ যুক্ত ছিল। পাঁচ বছর আগে একই মাত্রার নিঃসরণের জন্য কোম্পানির সংখ্যা ছিল ৩৮টি। অর্থাৎ নিঃসরণ কম কোম্পানির হাতে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
তাহলে আসল প্রশ্নটা কোথায়
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এই ৩২ কোম্পানিকে বলা হচ্ছে না যে তারা নিজের কারখানার চিমনি দিয়ে বিশ্বের অর্ধেক কার্বন সরাসরি বাতাসে ছাড়ছে। কার্বন মেজরসের হিসাব মূলত কোম্পানিগুলোর উৎপাদিত জীবাশ্ম জ্বালানি ও সিমেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরাসরি উৎপাদন-সম্পর্কিত নিঃসরণ এবং তাদের বাজারজাত জ্বালানি ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট নিঃসরণকে হিসাবের মধ্যে আনে। তাই ‘বিশ্বের মোট সব ধরনের কার্বন নিঃসরণের অর্ধেক’ বলার চেয়ে ‘জীবাশ্ম জ্বালানি ও সিমেন্ট-সম্পর্কিত কার্বন নিঃসরণের অর্ধেকের বেশি’ বলা বেশি নির্ভুল। ২০২৪ সালে ডেটাবেজে থাকা ১৬৬টি সক্রিয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোট ৩৪.৭ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণ যুক্ত ছিল, যা ওই বছরের বৈশ্বিক জীবাশ্ম জ্বালানি ও সিমেন্ট-সম্পর্কিত নিঃসরণের প্রায় ৮০ শতাংশের সমান।
এই তালিকার সবচেয়ে বড় চমক হলো, দূষণের বড় অংশ শুধু বেসরকারি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে নেই। ২০২৪ সালে শীর্ষ ২০ নিঃসরণকারীর ১৬টিই ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান। সৌদি আরামকো একাই ২০২৪ সালে প্রায় ১.৭৯ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কার্বন ডাই-অক্সাইডের হিসাবেই এর পরিমাণ প্রায় ১.৬৫ বিলিয়ন টন। বিনিয়োগকারী মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর মধ্যে এক্সনমোবিলের সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রায় ৬৭৭ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণ। অর্থাৎ জলবায়ু সংকটের গল্পটি শুধু ‘বড় করপোরেশন বনাম পরিবেশ’ নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের জ্বালানি নীতি, রাজস্ব, রপ্তানি আয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তাও সরাসরি জড়িয়ে আছে।
আর এখানেই বিষয়টি আরও জটিল। বিশ্ব একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে বাস্তবে তেল, গ্যাস ও কয়লার উৎপাদন এখনো বাড়ছে। গ্লোবাল কার্বন বাজেটের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ ছিল প্রায় ৩৭.৮ বিলিয়ন টন, যা আগের বছরের তুলনায় ১.১ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের প্রাথমিক হিসাবেও তা আরও বেড়ে প্রায় ৩৮.১ বিলিয়ন টনে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ সমস্যাটা শুধু এই নয় যে নিঃসরণ কয়েকটি কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত; বড় প্রশ্ন হলো, সেই কোম্পানিগুলোর উৎপাদনও কেন এখনো বাড়ছে।
এখানে অর্থনীতির একটি পুরোনো বাস্তবতা সামনে আসে। তেল, গ্যাস ও কয়লা শুধু দূষণের উৎস নয়; এগুলো এখনো বিশ্বের শিল্প, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও বাণিজ্যের বড় অংশ চালায়। ফলে কোনো সরকার হঠাৎ উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে না। আবার উৎপাদন বাড়াতে থাকলে জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সংঘাতটা আসলে ‘উন্নয়ন বনাম পরিবেশ’-এর সরল লড়াই নয়; প্রশ্ন হচ্ছে, কে উৎপাদন করবে, কতদিন করবে, সেই উৎপাদনের ক্ষতির মূল্য কে দেবে এবং বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগের খরচ কে বহন করবে।
বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অবশ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিতও আছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ২০২৫ সালের হিসাবে, বিশ্বে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পথে ছিল, যা তেল, গ্যাস ও কয়লায় বিনিয়োগের প্রায় দ্বিগুণ। সৌরবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ গ্রিড, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে অর্থ যাচ্ছে দ্রুত। কিন্তু এই পরিবর্তন এখনো অসম। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মূলধনের খরচ বেশি, বিদ্যুৎ অবকাঠামো দুর্বল এবং জ্বালানি চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে ধনী দেশগুলো যে গতিতে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে যেতে পারছে, বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য একই পথ সবসময় বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।
তাহলে ৩২টি কোম্পানির এই হিসাব আমাদের কী শেখায়? সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, জলবায়ু নীতিতে শুধু সাধারণ মানুষের আচরণ বদলানোর ওপর নির্ভর করলে হবে না। একজন মানুষ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করলেন, গাড়ি কম চালালেন এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদকরা যদি তেল, গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ বাড়াতে থাকে, তাহলে বৈশ্বিক হিসাব খুব দ্রুত বদলাবে না। বরং বড় উৎপাদকদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত, উৎপাদন পরিকল্পনা, সরকারি মালিকানা, কার্বন মূল্য, করনীতি এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে অর্থ স্থানান্তর এসবকেও জলবায়ু নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে।
একসময় জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনা ছিল মূলত বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা। এখন সেটি ধীরে ধীরে করপোরেট জবাবদিহি, বিনিয়োগ এবং অর্থনীতির প্রশ্ন হয়ে উঠছে। কার্বন মেজরসের ডেটা ইতোমধ্যে গবেষণা, নীতিনির্ধারণ এবং কিছু আইনি উদ্যোগেও ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ একটি কোম্পানি কত বছর ধরে কত জ্বালানি উৎপাদন করেছে এই হিসাব যখন পরিমাপযোগ্য হয়ে যায়, তখন ‘দূষণের দায় কার?’ প্রশ্নটিও আর পুরোপুরি বিমূর্ত থাকে না।
শেষ পর্যন্ত তাই গল্পটা ৩২টি কোম্পানির সংখ্যা নিয়ে যতটা, তার চেয়ে বেশি ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন নিয়ে। বিশ্ব যে জ্বালানি ব্যবহার করে, তার বড় অংশের সরবরাহ যদি ক্রমেই কমসংখ্যক উৎপাদকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার লড়াইটিও শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের পরিবর্তন দিয়ে শেষ করা যাবে না। বাজার, রাষ্ট্র ও বড় জ্বালানি কোম্পানির সিদ্ধান্ত এই তিন জায়গাতেই পরিবর্তন আনতে হবে। আর সেই পরিবর্তন যত দেরি হবে, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক খরচও তত বড় হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

