টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার আঘাতে দেশের হাওরাঞ্চলে এবার বড় ধরনের কৃষি বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত দেশের সাতটি হাওর জেলায় প্রায় ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বোরো ধান, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে বিবেচিত।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, হাওর অঞ্চলের মোট কৃষিজমির ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ, অর্থাৎ ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার টন বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। এই দুর্যোগে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার কৃষক।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকাগুলো মূলত এক ফসলনির্ভর অঞ্চল। বছরের একটি বড় সময় এসব এলাকা পানির নিচে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা বোরো ধান আবাদ করেন এবং সেই ধানের ওপরই নির্ভর করে পুরো বছরের জীবিকা। ফলে মৌসুমের শেষ দিকে এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকদের জন্য ভয়াবহ আঘাত হয়ে এসেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার সাতটি হাওর জেলায় ৪ লাখ ৫৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ধান কাটা শেষ হলেও বাকি অংশ পানিতে তলিয়ে যায় বা অতিবৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেষ সময়ে এমন ক্ষতি কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে বড় সংকটে ফেলতে পারে, কারণ অধিকাংশ কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৫০ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। সরকার এবার ২ কোটি ২৪ লাখ টন বোরো উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তবে হাওরাঞ্চলের এই ক্ষতি সেই লক্ষ্যে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাওর অঞ্চলের প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ এলাকা সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বাঁধ ভেঙে যাওয়া এবং এপ্রিলের ভারী বর্ষণের কারণে। অনেক জায়গায় কৃষকরা ধান কাটার আগেই মাঠ পানিতে ডুবে যায়। আবার কোথাও কাটা ধান শুকানোর আগেই বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গেছে।
কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের কৃষক ফয়জুল ইসলামের গল্প যেন পুরো হাওরাঞ্চলের বাস্তব চিত্র। পাঁচ একর জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন তিনি। এর মধ্যে দুই একরের ধান পানিতে তলিয়ে যায়। বাকি ধান কাটলেও মাড়াইয়ের মাঠে রাখা ধানে অঙ্কুর গজিয়ে যায়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ মণ ধান নষ্ট হয়েছে তার।
ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করা এই কৃষক এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে টাকা নিয়েছিলেন তিনি। এখন সেই ঋণ কীভাবে শোধ করবেন, তা ভেবেই অসহায় বোধ করছেন। তার ভাষায়, শেষ পর্যন্ত হয়তো জমি বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওরাঞ্চলে প্রতি বছরই প্রাকৃতিক ঝুঁকি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। টেকসই বাঁধ নির্মাণ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দ্রুত ধান কাটার প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকবে।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নির্ভুল ও স্বচ্ছ তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন। সেই তালিকার ভিত্তিতে আগামী তিন মাস কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
সরকারি সূত্র বলছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সহায়তা কার্যক্রম শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বৃষ্টির ঝুঁকি কমাতে ধান রোপণ ও কাটার সময়সূচি কিছুটা এগিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, হাওরের এই ক্ষতি শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত সংকট নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও একটি সতর্কবার্তা। কারণ দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো ধান থেকে। ফলে হাওরাঞ্চলের ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে বাজারে চালের দাম ও সরবরাহেও প্রভাব ফেলতে পারে।

