র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) নিয়ে দেশি–বিদেশি বিভিন্ন মহলের দীর্ঘদিনের সমালোচনা ও বিলুপ্তির দাবির মধ্যেও বাহিনীটি আপাতত বহালই থাকছে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ঘিরে র্যাবকে বিলুপ্ত করার সুপারিশ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন দিলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
র্যাবের ভবিষ্যৎ কাঠামো কী হবে—সংস্কার, পুনর্গঠন নাকি বিলুপ্তি—এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান না থাকায় তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাহিনীটি আপাতত চলমান থাকলেও এর কার্যক্রম, ক্ষমতা ও কাঠামো নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত ঝুলে রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি জানানো হয়েছে, মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি আধুনিক ও পেশাদার এলিট ফোর্স গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই বাহিনীর নাম, কাঠামো বা আইনি ভিত্তিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
র্যাব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। গত দুই দশকে গুম, ক্রসফায়ার এবং গোপন বন্দিশালার অভিযোগে বারবার আলোচনায় এসেছে বাহিনীটি। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় র্যাবের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলেছে।
সম্প্রতি গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়। একই ধরনের দাবি তোলে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাও। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনেও একসময় বিভিন্ন দল র্যাব বিলুপ্তির পক্ষে অবস্থান নিলেও ক্ষমতায় গিয়ে তাদের অবস্থান পরিবর্তনের নজির রয়েছে।
২০০৪ সালে গঠিত এই এলিট ফোর্স শুরুতে সন্ত্রাস দমন ও সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক অভিযান চালিয়ে আলোচনায় আসে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ভূমিকা ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন বাড়তে থাকে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ র্যাবকে বিতর্কিত করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, র্যাব নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জবাবদিহির ঘাটতি এবং আইনি দায়মুক্তির বিধান। বিদ্যমান আইনের একটি ধারা অনুযায়ী, বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে সৎ উদ্দেশ্যে নেওয়া কর্মকাণ্ডে মামলা বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে সমালোচকরা মনে করেন।
মানবাধিকারকর্মীদের একাংশ বলছেন, শুধু বিলুপ্তি নয়, কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মূলত পুলিশের হলেও বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পৃথক ইউনিট গঠন করা যেতে পারে, যাতে জবাবদিহি ও মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।
অন্যদিকে বাহিনীটির সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের দাবি, নতুন করে বড় ধরনের অভিযান কমে গেলেও তারা এখনো নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত। বিতর্ক এড়াতে এবং নতুন করে কোনো অভিযোগ না ওঠে—এমন লক্ষ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমিত রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
র্যাব বিলুপ্তি নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই চললেও বাস্তবে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠছে—বাহিনীটি কি সংস্কার হবে, নাকি বর্তমান কাঠামোতেই চলতে থাকবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারের অবস্থান ও ভাবমূর্তি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

