চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দুই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা—চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ—এর গৃহকর বিরোধ নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে বন্দর কর্তৃপক্ষের বার্ষিক গৃহকর প্রায় ২২০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ২৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকায় নির্ধারণ করেছে সিটি করপোরেশন। আগে এই খাতে বন্দরকে বছরে মাত্র ৪৫ কোটি টাকা দিতে হতো।
সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, বন্দর এলাকার বিপুল স্থাপনার পুনর্মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নতুন করহার নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ৩ মে আপিল শুনানির পর এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয় এবং পরদিনই বন্দর কর্তৃপক্ষকে নোটিশ পাঠানো হয়। শুনানিতে দুই পক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
নতুন করহার কার্যকর হলে চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য এটি বড় আর্থিক চাপ তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, দেশের সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষ এককভাবে সিটি করপোরেশনকে সবচেয়ে বেশি গৃহকর প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।
বন্দর কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের দাবি, যৌথ জরিপ অনুযায়ী গৃহকর হওয়া উচিত প্রায় ১৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। তাদের মতে, বর্তমান করহার বাস্তবতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। ফলে বিষয়টি নিয়ে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে সিটি করপোরেশন বলছে, ২০১৬-১৭ সালের পুনর্মূল্যায়নে আগের করহার ১৬০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা কমিয়ে ৪৫ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়, যা রাজস্ব ক্ষতির কারণ হয়েছে। নতুন মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর পুনরায় মূল্যায়ন করে পুরোনো হার অনুযায়ী কর আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
গৃহকর ইস্যুতে দুই প্রতিষ্ঠানের বিরোধ নতুন নয়। গত বছর থেকেই বিষয়টি নিয়ে টানাপোড়েন চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় একটি যৌথ কমিটিও গঠন করা হয়েছিল, তবে তাতেও সমাধান আসেনি। বরং এখন বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বন্দরের ভারী যানবাহন নগরের সড়ক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে, যার রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করছে সিটি করপোরেশন। তাই কর পুনর্মূল্যায়নকে তারা ন্যায্য বলে দাবি করছে।
অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছর পরপর কর পুনর্মূল্যায়ন হওয়ার কথা থাকলেও নতুন হার কার্যকর করার সময় ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারা এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাছে দিকনির্দেশনা চেয়েছিল, তবে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কর নির্ধারণ সিটি করপোরেশনের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। এ অবস্থায় বন্দর কর্তৃপক্ষ চলতি অর্থবছর থেকে পূর্বের নির্ধারিত কর পরিশোধ বন্ধ রেখেছে। ফলে দুই সংস্থার মধ্যে আর্থিক ও প্রশাসনিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের মতো প্রতিষ্ঠানের করসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা নগর ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। দ্রুত সমাধান না হলে ভবিষ্যতে এই বিরোধ আরও জটিল আকার নিতে পারে।

