বাংলাদেশের বড় করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর প্রকৃত পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তার ভাষায়, দেশের কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান পরিস্থিতি অনুযায়ী কখনো নিজেদের দেশি, আবার কখনো বিদেশি হিসেবে উপস্থাপন করে সুবিধা নেয়। এতে নীতিনির্ধারণ, বিনিয়োগ মূল্যায়ন এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত ‘কৌশলগত সম্পদে দেশি বিনিয়োগের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ ও ঢাকা স্টিম। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।
আলোচনায় বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশের আইনি কাঠামোয় এখনো পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা হয়নি কোন প্রতিষ্ঠানকে প্রকৃত অর্থে দেশি এবং কোনটিকে বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তার মতে, এই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে কিছু বড় গোষ্ঠী প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের পরিচয় বদলে নেয়। যখন সরকারি সুবিধা বা নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন হয়, তখন তারা দেশি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে। আবার স্বার্থবিরোধী পরিস্থিতি তৈরি হলে বিদেশি পরিচয়ের সুবিধা নিতে চায়।
তিনি মনে করেন, এমন পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নীতিতেই অস্পষ্টতা তৈরি করছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে সুশাসন ও জবাবদিহিতাকেও দুর্বল করছে। এ কারণে কোম্পানির মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ কাঠামো নির্ধারণে আরও শক্ত ও স্বচ্ছ আইন প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের উদাহরণ তুলে ধরে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ওই দেশগুলো সুশাসন, দক্ষতা এবং পেশাদার প্রশাসনের ওপর ভর করে এগিয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ স্থবিরতার অন্যতম কারণ দুর্নীতি ও নীতিগত দুর্বলতা। তার ভাষায়, দেশে এখন দুর্নীতির ধরন বদলে গেছে। আগে দুর্নীতি দৃশ্যমান ছিল, এখন তা অনেকাংশে অদৃশ্য আর আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। ওই চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্র বিদেশ থেকে প্রস্তুত করে এনে সরকারি কর্মকর্তাদের সই করতে বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে বিশেষ বাহিনীর সহায়তায় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনাও দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বদিউল আলম মজুমদারের মতে, চুরি, লুটপাট ও প্রভাবভিত্তিক অর্থনীতি এখন দেশের অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে প্রশাসন ও ব্যবসা—উভয় ক্ষেত্রেই পেশাদারত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রশাসনে পদোন্নতি বা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে কর্মদক্ষতাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। তিনি জানান, সরকার অর্থনীতিতে গতি আনতে বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশের নীতিনির্ধারণে এক ধরনের ‘বশ্যতা সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে। ফলে বড় আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, অন্য দেশ নিজেদের স্বার্থে শক্ত অবস্থান নিতে পারলে বাংলাদেশও পারে, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে।
গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে চলমান প্রতিযোগিতার বিষয়ও উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, বিদেশি দুটি বড় কোম্পানির পাশাপাশি দেশীয় প্রতিষ্ঠানও বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তারপরও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকার আলোচনায় এগিয়ে যাচ্ছে, যা দেশীয় বিনিয়োগ অগ্রাধিকারের প্রশ্নে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

