দেশের গ্রামীণ বিদ্যুৎব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নতুন প্রস্তাবকে ঘিরে। নিজেদের আর্থিক ঘাটতি কমাতে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের লাভজনক সমিতিগুলোর ওপর বাড়তি পাইকারি বিদ্যুৎমূল্য চাপাতে চায় পিডিবি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রস্তাব কার্যকর হলে গ্রামে কম খরচে বিদ্যুৎ সরবরাহের বর্তমান কাঠামো বড় ধাক্কায় পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ গ্রাহকের ওপর।
বর্তমানে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড বা আরইবি দেশের প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে পরিচালিত এই ব্যবস্থার আওতায় দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর প্রায় ৭৭ শতাংশ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে লাভজনক শিল্পাঞ্চলভিত্তিক সমিতিগুলোর আয়ের মাধ্যমে লোকসানে থাকা গ্রামীণ সমিতিগুলোকে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতের ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘ক্রস সাবসিডি’।
কিন্তু পিডিবির নতুন প্রস্তাবে এই ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে জমা দেওয়া প্রস্তাবে পিডিবি বলেছে, আরইবির ২১টি লাভজনক সমিতির জন্য আলাদা করে বেশি দামে পাইকারি বিদ্যুৎ নির্ধারণ করা উচিত। কারণ এসব সমিতির গ্রাহক কাঠামো অনেকটা শহুরে বিতরণ কোম্পানি ডেসকো ও ডিপিডিসির মতো।
পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে আরইবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনছে ৬ টাকা ২৪ পয়সায়, অথচ খুচরা পর্যায়ে গড়ে বিক্রি করছে প্রায় সাড়ে ৮ টাকায়। সংস্থাটির দাবি, এ কারণে আরইবি অন্য বিতরণ কোম্পানির তুলনায় বেশি সুবিধা পাচ্ছে এবং সরকারের ভর্তুকির বড় অংশ তাদের পেছনে ব্যয় হচ্ছে।
তবে আরইবির কর্মকর্তারা বলছেন, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত অর্থবছরে মাত্র ১৩টি সমিতি প্রকৃত মুনাফা করেছে। চারটি সমিতি কোনোমতে লোকসান এড়াতে পেরেছে। বাকি ৬৩টি সমিতি টিকিয়ে রাখতে লাভজনক সমিতিগুলোর আয় থেকে ৩ হাজার ৫০০ কোটির বেশি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
তাদের ভাষ্য, লাভজনক সমিতিগুলোর ওপর আলাদা চাপ তৈরি করা হলে পুরো গ্রামীণ বিদ্যুৎব্যবস্থাই বিপর্যস্ত হবে। কারণ লোকসানে থাকা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমিতিগুলো তখন আর টিকে থাকতে পারবে না। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন এবং ক্ষুদ্র শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শহর ও গ্রামের বিদ্যুৎব্যবস্থার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। শহরাঞ্চলে বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহক বেশি হওয়ায় বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে আয়ও বেশি হয়। কিন্তু গ্রামে অধিকাংশ গ্রাহক আবাসিক এবং কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী। আরইবির ব্যবহৃত মোট বিদ্যুতের প্রায় ৫৬ শতাংশই যায় আবাসিক গ্রাহকদের কাছে, যাদের বড় অংশ নিম্নআয়ের মানুষ।
এ কারণে লাইফলাইন ও নিম্নস্তরের গ্রাহকদের কম দামে বিদ্যুৎ দিতে গিয়ে আরইবিকে লোকসান বহন করতে হয়। এখন পিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী পাইকারি দাম বাড়লেও নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের খুচরা দাম না বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে আরইবির খরচ বাড়বে, কিন্তু আয় বাড়বে না।
পিডিবি অবশ্য বলছে, বিদ্যুৎ খাতে বাড়তে থাকা ভর্তুকির চাপ সামাল দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির আর্থিক ঘাটতির প্রায় ৬৩ শতাংশ তৈরি হয়েছে আরইবিকে কম দামে বিদ্যুৎ দেওয়ার কারণে। ভবিষ্যতে বড় শিল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে সংযোগ বাড়লে এই চাপ আরও বাড়বে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, বর্তমানে আরইবির অধীনে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াটের ১৯টি বড় সংযোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এগুলো চালু হলে বছরে আরও প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ভর্তুকির চাপ তৈরি হতে পারে।
পিডিবির যুক্তি হলো, এসব বড় শিল্পগ্রাহককে যদি ৩৩ কেভির পরিবর্তে ১৩২ কেভি লাইনের মাধ্যমে সরাসরি বিদ্যুৎ দেওয়া হয়, তাহলে সংস্থাটির আয় বাড়বে এবং ভর্তুকি কমবে। উদাহরণ হিসেবে জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেছে তারা। পিডিবির হিসাবে, প্রকল্পটিতে সরাসরি বিদ্যুৎ দিতে পারলে বছরে প্রায় ৯০০ কোটির বেশি অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, আরইবির পুরো কাঠামোই ক্রস সাবসিডির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। লাভজনক সমিতিগুলোকে আলাদা করে দিলে গ্রামের বিদ্যুৎব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। তার অভিযোগ, নিজেদের অতিরিক্ত ব্যয় ও ভুল নীতির দায় এখন পিডিবি সাধারণ গ্রাহক ও আরইবির ওপর চাপাতে চাইছে।
এদিকে পাইকারি দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের পর খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদনও করেছে আরইবি। সংস্থাটি বলছে, চলতি অর্থবছরে তাদের ঘাটতি বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। তাই অন্তত ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ খুচরা মূল্য বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের অদক্ষতা, উচ্চ ব্যয়ের কেন্দ্রভাড়া এবং ভর্তুকিনির্ভর নীতির কারণে এখন পুরো ব্যবস্থার চাপ ধীরে ধীরে ভোক্তাদের ওপর এসে পড়ছে। তবে গ্রামীণ বিদ্যুতের বর্তমান ভারসাম্য নষ্ট হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে নিম্নআয়ের মানুষ ও কৃষিনির্ভর অঞ্চলগুলো।

