স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ এখন আর বিকল্প কোনো বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মূল শর্তে পরিণত হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার ঢাকার একটি স্থানীয় হোটেলে অনুষ্ঠিত “সহনশীল সরবরাহ শৃঙ্খল ও বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ” শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ব্যবস্থার দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এখন নতুন এক ধাপে প্রবেশ করছে। শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা বিকাশ এবং নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতার মাধ্যমে দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শুধু কম উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হবে টেকসই উন্নয়ন, স্বচ্ছতা, শ্রমমান, পরিবেশগত দায়িত্বশীলতা এবং নৈতিক ব্যবসায়িক চর্চা।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রেতা, বিনিয়োগকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ভোক্তারা সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসন মানদণ্ড এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক নতুন নিয়ম ও প্রত্যাশা বাড়ছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। তিনি বলেন, এখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের প্রত্যাশা ক্রমেই বাড়ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর মতে, শিল্প খাতে দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক চর্চা জোরদার করা গেলে আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ একটি দায়িত্বশীল ও প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এতে উচ্চমূল্যের ও উদীয়মান বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়বে, টেকসই বিনিয়োগ আসবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতাও আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্য অর্জনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ সম্পর্কিত নীতি সমন্বয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ইতোমধ্যে সবুজ শিল্পায়ন, টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদন এবং পরিবেশ ও সামাজিক মানদণ্ড অনুসরণের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে।
তিনি জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণভিত্তিক একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করবে এবং নীতিগত দিকনির্দেশনা, সচেতনতা বৃদ্ধি ও সক্ষমতা উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দায়িত্বশীল ও টেকসই ব্যবসায়িক রূপান্তর কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য সরকার, বেসরকারি খাত, শিল্প সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী এবং সুশীল সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, এমন একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে বড় ও ছোট সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধাপে ধাপে দায়িত্বশীল চর্চা গ্রহণ করতে পারবে এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হবে।
অনুষ্ঠান আয়োজন ও বাংলাদেশে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ধারাবাহিক সহযোগিতার জন্য বাণিজ্যমন্ত্রী জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. আবদুর রহিম খান, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ডেপুটি কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ সোনালি দায়ারাত্নে এবং কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার ওয়াইস পেরি। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ।

