জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে দীর্ঘদিনের আলোচিত গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতির অবসান ঘটেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক মিছিল-মিটিংয়ে নেওয়া কিংবা হলে থাকার শর্তে আনুগত্য আদায়ের ঘটনাও অনেকটাই কমেছে। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আগের দমন-পীড়নের ধরন বদলালেও ‘ট্যাগ’ দিয়ে হেনস্তা, ভয়ভীতি ও মারধরের সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি থামেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও বিভাগের একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে যেমন কাউকে ‘শিবির’ সন্দেহে নির্যাতন করা হতো, এখন তেমনি কাউকে ‘ছাত্রলীগের লোক’ বা ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে অপদস্থ, মারধর কিংবা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। ফলে রাজনৈতিক সহনশীলতার সংকট এখনো কাটেনি বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে। দীর্ঘদিনের একক প্রভাব হারায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ। এর পর থেকেই ইসলামী ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে ডাকসু ও বেশ কয়েকটি হল সংসদে শিবির-সমর্থিত নেতাদের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি ছাত্রদল, বামপন্থী ছাত্রসংগঠন, ইসলামপন্থী বিভিন্ন সংগঠন এবং জাতীয় ছাত্রশক্তিও সক্রিয় রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক পরিবেশেও পরিবর্তনের চিত্র মিলেছে। আগে যেখানে একটি ছোট কক্ষে ৩০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে থাকতেন, এখন সেখানে তুলনামূলক স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরেছে। সূর্য সেন হলের বহুল আলোচিত ‘লাদেন গুহা’ নামে পরিচিত গণরুম এখন খেলাধুলার কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জহুরুল হক হলের বিভিন্ন কক্ষেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, আগে হলে সিট পাওয়া অনেকটাই নির্ভর করত রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর। ছাত্রলীগের নেতারা প্রশাসনের সহায়তায় কক্ষ বণ্টন থেকে শুরু করে ক্যানটিন নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত সবকিছু প্রভাবিত করতেন। হলের ক্যানটিনে বাকির নামে ‘ফাও খাওয়া’ ও চাঁদাবাজির অভিযোগও ছিল ব্যাপক। এর প্রভাব পড়ত সাধারণ শিক্ষার্থীদের খাবারের মানে। বর্তমানে সেই চাপ কমেছে এবং ক্যানটিনের খাবারের মান কিছুটা উন্নত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা।
তবে পরিবর্তনের মাঝেও উদ্বেগ রয়ে গেছে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, রাজনৈতিক নিপীড়নের ভাষা বদলেছে, কিন্তু সংস্কৃতি পুরোপুরি বদলায়নি। এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা ক্যাম্পাসে কাউকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করে হেনস্তা করা হচ্ছে। শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও দলীয় ট্যাগ লাগিয়ে অপমান বা বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, আগের মতো প্রকাশ্য গেস্টরুম নির্যাতন না থাকলেও ভিন্নমতকে সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা এখনো আছে। এতে নতুন ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। কেউ রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকতে চাইলেও তাকে কোনো না কোনো পক্ষের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রচার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, এখন হলের আসন বণ্টনে মেধা ও আবেদনের ভিত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠকক্ষ, চিকিৎসাকেন্দ্র ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও কিছু উন্নয়ন এসেছে। আগে অবহেলিত চিকিৎসাকেন্দ্রে সংস্কার কাজ হয়েছে এবং নতুন চিকিৎসা সরঞ্জাম যুক্ত করা হয়েছে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একাংশ বলছেন, শুধু গণরুম বা গেস্টরুম বন্ধ হলেই চলবে না, ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ভয়ভীতি, ‘মব’ সংস্কৃতি কিংবা প্রতিপক্ষকে অপদস্থ করার প্রবণতা বন্ধ না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন পূর্ণতা পাবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দীর্ঘদিনের দমনমূলক ছাত্ররাজনীতির কিছু কাঠামো ভেঙেছে, অন্যদিকে নতুন বাস্তবতায় সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। শিক্ষার্থীরা চান, অতীতের নির্যাতন যেন আর কোনো রূপে ফিরে না আসে এবং বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকার অর্থে মুক্ত ও নিরাপদ জ্ঞানচর্চার জায়গা হয়ে উঠুক।

