দুর্নীতি দমন কমিশনে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব না থাকায় সংস্থাটির কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। তবে তদন্তের নামে জব্দ হওয়া ব্যাংক হিসাব, বিদেশযাত্রা নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ আটকে থাকার কারণে শত শত ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখনো ভোগান্তিতে রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তদন্তে সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ না মিললেও অনেকের বিরুদ্ধে নেওয়া কঠোর ব্যবস্থা এখনো প্রত্যাহার হয়নি।
দুদকের সাবেক কমিশন পদত্যাগের পর প্রায় তিন মাস ধরে প্রতিষ্ঠানটি কমিশনবিহীন অবস্থায় চলছে। এর ফলে নতুন মামলা অনুমোদন, চার্জশিট দাখিল, তদন্ত নিষ্পত্তি কিংবা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে। আইনি কাঠামো অনুযায়ী কমিশনের অনুমোদন ছাড়া এসব কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থ পাচারের অভিযোগে অন্তত ১১টি ব্যক্তি ও শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে অনেকের ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পদ ক্রোক এবং বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ তদন্তের পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে যৌথ তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
এরপরও তাদের ব্যাংক হিসাব খুলে দেওয়া হয়নি কিংবা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত বিনা বিচারে শাস্তি ভোগ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ী মহলের দাবি, এতে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, বিনিয়োগ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অর্থ পাচার তদন্তে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং দুদক যৌথভাবে কাজ করেছে। তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতায় নথিপত্র প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু তদন্তের বড় অংশ এখন অনুমোদনের অভাবে আটকে আছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, শত শত অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত থাকলেও কমিশন না থাকায় সেগুলো অনুমোদন দেওয়া যাচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম ধীর হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে নির্দোষ ব্যক্তিরাও ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দুদক আইনের অধীনে তদন্ত, মামলা, চার্জশিট কিংবা বিদেশযাত্রা নিষেধাজ্ঞার মতো প্রায় সব সিদ্ধান্তেই কমিশনের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু চেয়ারম্যান ও কমিশনারের পদ খালি থাকায় প্রশাসনিক কাজ ছাড়া সংস্থাটির মূল কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার গত মার্চ মাসে পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে নতুন কমিশন গঠন নিয়ে সরকারের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে। আইন অনুযায়ী কমিশনার পদ শূন্য হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নতুন নিয়োগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় কমিশনবিহীন অবস্থা দেশের দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এতে আইনের শাসন ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে তদন্তাধীন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, আগের অধ্যাদেশে তদন্ত ও বিচার ছাড়াই সম্পদ জব্দের মতো কিছু ক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছিল, যা মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। পরবর্তীতে সেই অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানোর পর পুরোনো আইন আবার পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত আইন অনুযায়ী নতুন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি করার বিধান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সরকার শিগগিরই সার্চ কমিটি গঠন করতে পারে। তবে নতুন কমিশন নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত দুদকের অচলাবস্থা আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি দমন কার্যক্রম কার্যকর রাখতে হলে একদিকে যেমন স্বাধীন ও সক্রিয় কমিশন প্রয়োজন, অন্যদিকে তদন্তের নামে হয়রানি বন্ধ করাও জরুরি। অভিযোগ প্রমাণের আগেই দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংক হিসাব জব্দ বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে তা ব্যক্তি অধিকার, ব্যবসা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তাদের মতে, দ্রুত কমিশন পুনর্গঠন, ঝুলে থাকা তদন্ত নিষ্পত্তি এবং নির্দোষদের বিরুদ্ধে নেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করলে দুদকের প্রতি জনআস্থা আরও কমে যেতে পারে।

